মিয়ানমার সীমান্তবর্তী পর্যটন জেলা কক্সবাজারে নতুন করে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ এবং ক্যাম্পগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ জন্মহারের কারণে রোহিঙ্গা সংকট দিন দিন আরও ভয়াবহ ও জটিল আকার ধারণ করছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। এর ওপর যুক্ত হয়েছে ক্যাম্পগুলোর আশঙ্কাজনক জন্মহার—যেখানে প্রতিদিন গড়ে জন্ম নিচ্ছে শতাধিক শিশু। বিপুল এই জনসংখ্যার চাপ কক্সবাজারের স্থানীয় অর্থনীতি, সামাজিক ভারসাম্য, আইনশৃঙ্খলা এবং পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
১৬ মাসে দেড় লাখ নতুন অনুপ্রবেশ: গত ১৩ মে প্রকাশিত ইউএনএইচসিআরের মাসিক প্রতিবেদনে জানানো হয়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান জাতিগত সংঘাত ও সহিংসতার কারণে গত ১৬ মাসে নতুন করে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৬৯ জন রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়ে আসা এই শরণার্থীরা ইতোমধ্যে নিজেদের নাম নিবন্ধনভুক্ত করেছে। এমনকি গত এপ্রিল মাসেও নতুন করে ২ হাজার ৭৮০ জন রোহিঙ্গা নিবন্ধিত হয়েছে। উখিয়া ও টেকনাফের মাত্র ২৪ বর্গকিলোমিটার পাহাড়ি এলাকায় এখন প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার চাপ সামলাতে হচ্ছে, যা এই অঞ্চলটিকে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী এলাকায় পরিণত করেছে। যেখানে স্থানীয় অধিবাসী মাত্র ৫ লাখ, সেখানে শরণার্থীর সংখ্যা তার প্রায় তিনগুণ।
প্রতিদিন জন্মাচ্ছে ১০০ শিশু, অর্থায়নে ঘাটতি: ক্যাম্পগুলোর জনসংখ্যা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট রোহিঙ্গার ৫২ শতাংশই শিশু, ৪৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৪ শতাংশ প্রবীণ। উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টি নতুন শিশুর জন্ম হচ্ছে। সেই হিসাবে বছরে প্রায় ৩০ হাজার শিশু যুক্ত হওয়ায় সংকট জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে অসচেতনতা, রক্ষণশীল সামাজিক কাঠামো এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিতে অনীহার কারণে সরকারের নীতি সেখানে ব্যর্থ হচ্ছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যৌথভাবে ২০২৫-২৬ সালের ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান’ (JRP)-এর আওতায় ৯৩ কোটি ৪৫ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তা চেয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চাহিদার মাত্র ২১.৭ শতাংশ অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। এই তহবিল সংকটের কারণে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার শিশুর শিক্ষাকার্যক্রম এবং মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা এখন গভীর ঝুঁকিতে পড়েছে।
সার্বভৌমত্বের হুমকি ও ৮ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস: গত ১১ মে কক্সবাজার প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এনজিও প্রতিনিধিদের মোর্চার (সিসিএনএফ) কো-চেয়ারম্যান রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে দুর্বল নজরদারির সুযোগে প্রতিনিয়ত নতুন অনুপ্রবেশ ঘটছে। তিনি অবিলম্বে একটি শক্তিশালী ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশন’ গঠনের দাবি জানান এবং ক্যাম্পে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের বিরোধিতা করে বলেন, এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। এদিকে বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কারণে ইতোমধ্যে কক্সবাজারের প্রায় ৮ হাজার একর সংরক্ষিত বনভূমি ও পাহাড় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। গাছপালা উজাড়ের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে এবং এশিয়ান হাতিসহ বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ ক্ষেত্র চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে।



















