বিগত সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে দুর্বল করে রাখার কারণেই দেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট ও আমদানিনির্ভরতা তৈরি হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে দেশকে জ্বালানিতে স্বনির্ভর ও টেকসই ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিতে সরকার বহুমুখী ও সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের মৌখিক প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।
সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) নতুন গ্যাস যুক্ত হয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে আরও সাতটি কূপ খননের কাজ চলছে। এগুলোর কাজ শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বাকি কূপগুলোও পর্যায়ক্রমে খননের জন্য নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
নতুন গ্যাসের সন্ধানে অনুসন্ধান কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার বৃহৎ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাপেক্সকে আরও দক্ষ ও সক্ষম করতে দুটি আধুনিক রিগ কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অফশোর ও অনশোর মডেল পিএসসির আওতায় ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর আন্তর্জাতিক বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। পাশাপাশি অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদনের প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
এদিকে এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে আগ্রহী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই টার্মিনাল থেকে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে। এতে আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বাড়তে পারে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল অথবা পায়রা ও মোংলা বন্দর এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে আরও এক থেকে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নতুন উদ্যোগ
সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারিসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবহার বাড়াতে ২০২৬ সালের ৮ জুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব পণ্যের ওপর বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এ ছাড়া ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহ বাড়াতে নতুন আর্থিক মডেল চালু করা হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাসাবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের ছাদে স্থাপিত সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ১৫ পয়সা দরে কিনবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে। অন্যান্য সরকারি দপ্তরে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্যও বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সোলারের পাশাপাশি বায়ু বিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সরকারের এসব সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে একদিকে আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থিতিশীল, স্বনির্ভর ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।


















