সরকারি গম আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা ৩২ বছর আগের একটি পুরোনো মামলায় অবশেষে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন সাবেক খাদ্য পরিদর্শক এনায়েত করিম। তবে এই ন্যায়বিচার ও খালাসের রায় দেখতে পারলেন না তিনি নিজে। মৃত্যুর দীর্ঘ দেড় বছর পর চলতি বছরের ৪ মে হাইকোর্ট তাঁকে বিচারিক আদালতের দেওয়া দণ্ড থেকে সম্পূর্ণ খালাস দিয়েছেন এবং সম্প্রতি এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ে হাইকোর্ট অত্যন্ত আবেগঘন ও সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন, “বর্তমান আপিলকারী (এনায়েত করিম) যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি সম্মানজনক খালাসের (Honourable Acquittal) অধিকারী হতেন।” একই সঙ্গে তাঁর উত্তরাধিকারীদের ওপর থাকা যাবতীয় জরিমানার আর্থিক দায় থেকেও সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
মামলার প্রেক্ষাপট ও ৫৫ টন গমের ঘাটতি
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ১৯৯৪ সালের ৩১ আগস্ট খুলনার দৌলতপুর থানায় উপ-খাদ্য পরিদর্শক মো. জাহিদুজ্জামান এবং তাঁর তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খাদ্য পরিদর্শক এনায়েত করিমের বিরুদ্ধে এই দুর্নীতি মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। ১৯৯৩-১৯৯৪ অর্থবছরে সরকারি খাদ্য গুদামে দায়িত্ব পালনকালে প্রধান অভিযুক্ত জাহিদুজ্জামান সরকারি গমের হেফাজত, সঞ্চয় ও বিতরণের মূল দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে সরকারি কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন সুবিধাভোগীদের মাঝে গম বিতরণের পর একটি উচ্চপর্যায়ের সরেজমিন অডিট বা সরকারি তদন্ত করা হয়। সেই তদন্তে গুদামের মজুদে বড় ধরনের অসংগতি ধরা পড়ে এবং প্রায় ৫৫ দশমিক ৭৫১ মেট্রিক টন গমের ঘাটতি শনাক্ত করা হয়, যার তৎকালীন সরকারি প্রাক্কলিত মূল্য ছিল ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৮৩২ টাকা ১০ পয়সা।
বিচারিক আদালতের দণ্ড ও আইনি দীর্ঘসূত্রতা
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং ৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ১৯৯৯ সালের ২৮ এপ্রিল খুলনার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত এক ঐতিহাসিক রায় দেন। রায়ে মামলার প্রধান অভিযুক্ত জাহিদুজ্জামান এবং সহকারী হিসেবে দ্বিতীয় অভিযুক্ত এনায়েত করিমকে দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। এই রায়ের পর দুই আসামিই হাইকোর্টে পৃথক আপিল দায়ের করে জামিনে মুক্ত হন। এর মধ্যে ২০০৫ সালের ২৬ অক্টোবর প্রধান অভিযুক্ত জাহিদুজ্জামানের আপিল শুনানি শেষে বিচারপতি মো. ছিদ্দিকুর রহমান মিয়া তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে মামলা থেকে খালাস দেন এবং তিনি পুনরায় চাকরিতে যোগদান করে স্বাভাবিকভাবে অবসর নেন।
তবে এনায়েত করিমের ভাগ্য ছিল ভিন্ন। তাঁর বিরুদ্ধে তৎকালীন সময়ে আরও চারটি পৃথক মামলা থাকায় তিনি সেগুলোর আইনি লড়াই ও শুনানি নিয়ে দীর্ঘ বছর ব্যস্ত ছিলেন। যদিও পরবর্তীতে তিনি ওই চার মামলাতেও খালাস পান, কিন্তু ততদিনে খুলনার মূল আদালত থেকে এই মামলার নথিপত্র সংগ্রহ করা এবং আইনি দীর্ঘসূত্রতার কারণে হাইকোর্টে আপিল শুনানি শুরু করতে অনেক বিলম্ব হয়ে যায়।
জরিমানা না দিয়ে ছেলের আইনি লড়াই ও হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়
এই দীর্ঘ আইনি লড়াই চলাকালীনই ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর এনায়েত করিম মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর হাইকোর্ট থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল যে, মাত্র এক হাজার টাকা জরিমানা জমা দিয়ে দিলে মামলাটি এখানেই নিষ্পত্তি বা খালাস হয়ে যেতে পারে। কিন্তু মৃত বাবার গায়ে ‘দুর্নীতিবাজ’ বা ‘অপরাধী’ তকমা রাখতে রাজি ছিলেন না তাঁর সন্তান। কারণ জরিমানা দেওয়া মানেই পরোক্ষভাবে অপরাধ বা দণ্ড মেনে নেওয়া। তাই বাবার সম্মান রক্ষার্থে কোনো জরিমানা না দিয়ে ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার সনদ জমা দিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এনায়েত করিমের ছেলে।
আদালতে আপিলকারীর আইনজীবী শেখ এ কে এম মনিরুজ্জামান কবির প্রমাণ করেন যে, এনায়েত করিম কেবল ব্লক বা ফুড ইন্সপেক্টর হিসেবে তদারকি করছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট মূল গুদামের প্রত্যক্ষ হেফাজত, নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনার একক দায়িত্ব তাঁর ছিল না। এমনকি রাষ্ট্রপক্ষ বা প্রসিকিউশন তাঁর বিরুদ্ধে গম অপসারণ, স্টক রেজিস্টার জালিয়াতি বা অবৈধ নিষ্পত্তির কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষী হাজির করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। অপরদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী সাইফুল মালেক চৌধুরী বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখার পক্ষে যুক্তি দিলেও তা নথিপত্র দ্বারা টেকেনি।
হাইকোর্ট তাঁর পূর্ণাঙ্গ রায়ে জানান, চার্জশিটে ‘যোগসাজশের’ একটি অস্পষ্ট এবং সর্বজনীন অভিযোগ ছাড়া এনায়েত করিমের বিরুদ্ধে কোনো উল্লেখযোগ্য প্রমাণ নেই। কেবল সরকারি পদে থাকার কারণে তাকে এই মামলায় জড়ানো হয়েছিল। ফলে আদালত আপিল মঞ্জুর করে তাঁকে খালাস দেন। এই রায়ের ফলে এখন প্রয়াত এনায়েত করিমের পরিবার ও উত্তরাধিকারীরা তাঁর দীর্ঘদিনের বকেয়া পেনশন, গ্র্যাচুইটিসহ যাবতীয় পাওনা ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য সরকারের কাছে বৈধভাবে আবেদন করার অধিকার ফিরে পেলেন।



















