মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নতুন করে এক বড় ধরনের ও বিধ্বংসী সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে ইসরায়েলে অতিরিক্ত অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও মাঝ আকাশে জ্বালানি ভরার বিশেষ রিফুয়েলিং (ট্যাংকার) বিমান পাঠাতে শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে অঞ্চলজুড়ে অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েন, কঠোর ভ্রমণ সতর্কতা জারি, মার্কিন সামরিক কৌশলে বড় পরিবর্তন এবং ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নতুন ও বড় অভিযানের প্রস্তুতি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যৌথভাবে আবারও সংঘাতের মাত্রা বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে। যদিও ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা এখনই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধকে অনিবার্য বলতে নারাজ, তবু তাদের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন হচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি খুব দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। টানা আট রাত ধরে চলা ভয়াবহ হামলা-পাল্টা হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে গোলাগুলির এই পারষ্পরিক বিনিময় যেন এখন এক ধরনের দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়েছে। ইরানে প্রতিটি নতুন দফার হামলা শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয় এবং অভিযান সফলভাবে শেষ হওয়ার পর আরেকটি বিবৃতি প্রকাশ করে; জবাবে ইরানও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে মারছে এবং নতুন করে হুমকি উচ্চারণ করছে। আজ রবিবার (১৯ জুলাই, ২০২৬) সকালেও কুয়েতে এই সংঘাতের জেরে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে, যা পুরো অঞ্চলে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনের একাধিক বড় ঘটনার পর ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন সামনে এসেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে আরেক দফা ভয়াবহ উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য নিজেদের যুদ্ধপ্রস্তুতির মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যা প্রয়োজনে পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে ঘোষণা দেয়, একদিন আগে জর্ডানে ইরানের আকস্মিক হামলায় ২ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আরও ১ জন সেনা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। সংঘর্ষ পুনরায় শুরু হওয়ার পর এটাই প্রথম কোনো মার্কিন সামরিক প্রাণহানির ঘটনা, যা হোয়াইট হাউসকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস-কে জানান, সাম্প্রতিক কয়েক দিনে জর্ডানে আরও কয়েক ডজন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, নিহত সেনারা জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে অবস্থান করছিলেন, যে ঘাঁটির একটি ‘থাড’ (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গত মার্চ মাসে হামলার শিকার হয়েছিল। মার্কিন সামরিক গোয়েন্দারা আশঙ্কা করছেন, লক্ষ্য নির্ধারণে (টার্গেট অ্যাকুইজিশন) ইরান হয়তো চীন বা রাশিয়ার গোপন প্রযুক্তিগত সহায়তা পাচ্ছে, যার ফলে তারা মার্কিন এয়ার ডিফেন্সের সাথে খাপ খাইয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতির ও দিক পরিবর্তনকারী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনায় পেন্টাগনের কঠোরপন্থিরা এখন ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি ‘কাজ শেষ করার’ দাবি তুলছেন।
এই উত্তেজনার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই জার্মানির স্পাংডাহলেম বিমানঘাঁটি থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং ব্রিটেন থেকে অত্যাধুনিক স্টেলথ এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ইসরায়েলে স্থানান্তর করেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) নিশ্চিত করেছে, মার্কিন ট্যাংকার ও রিফুয়েলিং বিমানগুলো শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর নিজস্ব ঘাঁটিতেই সম্পূর্ণ সামরিক সুরক্ষায় মোতায়েন করা হচ্ছে। এই যুদ্ধবিমানগুলো মূলত ইরানের ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার রাডার ধ্বংসের (SEAD মিশন) কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। একই সাথে পেন্টাগন ভবিষ্যৎ হামলাকে আরও ক্ষুরধার করতে এবং ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে ড্রোন ও অন্যান্য মানববিহীন ব্যবস্থার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ানোর নতুন সামরিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী (মিডটার্ম) নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এই উত্তেজনাকে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত রাখার চেষ্টা করতে পারে, তবে ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধকে কতটুকু সীমাবদ্ধ রাখা যাবে, তা নিয়ে খোদ ওয়াশিংটনেই গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে।



















