সিলেটের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু ও ৭০০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক বিদ্যাপীঠ হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ শরিফ ঘিরে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অন্ধকার সাম্রাজ্য ও কোটি কোটি টাকা লোপাটের চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভক্তদের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে মাজারের ডেক ও দানবাক্স থেকে নগদ টাকা আত্মসাৎ, মানতের একই গবাদিপশু বারবার বিক্রি, কসাইবাণিজ্য, গিলাফ ও গোলাপজল জালিয়াতি এবং সুদের ব্যবসাসহ নানাবিধ উপায়ে এখানে এক বিভীষিকাময় লুটের মহোৎসব চালাচ্ছে খাদেম ও তাদের সহযোগীদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র। সম্প্রতি জনমনে তীব্র অসন্তোষের জেরে গত ১৮ জুন সিলেটের জেলা প্রশাসন মাজারের তিনটি ডেক ও চারটি দানবাক্স সিলগালা করে সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে আনার পর এই ভয়াবহ চুরির চিত্র সামনে আসে। গত ২২ জুন ও ১১ জুলাই—দুই দফায় মাত্র ২৫ দিনের জমানো টাকা গণনা করে দেখা যায় সেখানে ৬৪ লাখ টাকারও বেশি নগদ অর্থ, ১২টি দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণালংকার ও মানতের ৬৫টি ছাগল পাওয়া গেছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, মাত্র ২৫ দিনের এই বিশাল অঙ্কের প্রাপ্তিই প্রমাণ করে যে, প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি না থাকায় যুগের পর যুগ ধরে এখান থেকে কত শত কোটি টাকা প্রভাবশালী মহলের পকেটে গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাজারের প্রায় ৫০০ খাদেমের একটি বড় অংশকে জিম্মি করে এই অপরাধ নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে কেরানি সামুন মাহমুদ খান, খোকন ওরফে বকরি খোকন এবং দেওয়ান জহুর উদ্দির রশীদ। প্রতিদিন ফজর থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার জন্য নির্দিষ্ট একজন খাদেমের ‘বারি’ বা ডিউটি থাকে, যেখান থেকে দিনে গড়ে ৪-৫ লাখ এবং ছুটির দিনগুলোতে ১০ লাখ টাকারও বেশি আয় হয়, যার সিংহভাগই সিন্ডিকেটের মূল হোতারা ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়। এমনকি সাধারণ খাদেমদের অর্থকষ্টের সুযোগ নিয়ে চড়া সুদে ঋণ দিয়ে এখানে দাসত্ব প্রথা টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এই চক্রের বিশ্বস্ত সহযোগী মনি, কুতুব, বাবুল ও মিলনের নেতৃত্বে মাজার প্রাঙ্গণে সার্বক্ষণিক পকেটমার, ছিনতাইকারী ও জুতাচোর সিন্ডিকেট সক্রিয় রাখা হয়েছে, যার লভ্যাংশ সরাসরি মূল হোতাদের কাছে যায়। এছাড়া মাজারের প্রভাবশালী হেড বাবুর্চি সোহেল ও ফয়েজের নেতৃত্বে সাধারণ ভক্তদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের এক রোমহর্ষক অধ্যায় গড়ে উঠেছে; কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই তাকে চোর সাজিয়ে মারধর ও পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। মানতের পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত ফির চেয়ে ১০ গুণ বেশি টাকা আদায়, চামড়া ছাড়ানোর সময় সুকৌশলে ১০-১৫ কেজি আস্ত মাংস রেখে দেওয়া, শিন্নির অর্ধেক চুরি করা এবং ভক্তদের দেওয়া দামি গিলাফ ও গোলাপজল মাজার থেকে সরিয়ে পুনরায় দোকানে এনে চড়া দামে বিক্রি করার মতো জঘন্য জালিয়াতি নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই চরম অব্যবস্থাপনা ও দখলদারিত্ব বন্ধে কঠোর উদ্যোগ নেওয়ার পরপরই সিলেটের জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমকে রহস্যজনকভাবে বদলি হতে হয়েছে। সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সিলগালা করার পরও মাজারের সিন্ডিকেট সদস্যরা অপকৌশল হিসেবে নারীদের ইবাদতখানা বন্ধ করে দিয়েছে এবং ভক্তদের কাছ থেকে দানবাক্সে টাকা না ফেলে কবরস্থানের পাশের ঝরনা এলাকায় হাতে হাতে নগদ টাকা সংগ্রহ করছে, যা সরাসরি আত্মসাৎ করা হচ্ছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম জানান, মাজারে আগে কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাবের নিয়ম ছিল না বলেই এই স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এদিকে সিলেটের নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন (যিনি গত ১৩ জুলাই যোগদান করেছেন) জানিয়েছেন, মাজারের এই বিস্তর অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধানে ইতিমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে। অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিলেটের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ জানিয়েছেন, বর্তমানে দুদক কমিশন পুনর্গঠন না হওয়ায় আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা না গেলেও তারা সব ধরনের আন-অফিশিয়াল তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন এবং সবুজ সংকেত পেলেই এই দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করা হবে।



















