ইরানের সদ্যপ্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সম্পূর্ণ ‘নিরপরাধ’ উল্লেখ করে তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতি ফোঁটা ‘রক্তের’ কঠিন বদলা নেওয়ার তীব্র অঙ্গীকার করেছেন তাঁর ছেলে ও ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। বাবার দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর দেওয়া নিজের প্রথম আনুষ্ঠানিক বার্তায় এই চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন দেশটির নতুন এই শীর্ষ ধর্মীয় নেতা। আবেগঘন ও রণংদেহী সেই বার্তায় মোজতবা খামেনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “শত্রুদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া এখন আর কোনো একক সিদ্ধান্ত নয়, এটি আমাদের পুরো জাতির চাওয়া।”
উল্লেখ্য, চলতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে আকস্মিক যুদ্ধ শুরুর ঠিক প্রথম দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন দীর্ঘকালীন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। বাবার শেষ বিদায়ে তেহরান ও মাশহাদের রাজপথে লাখো মানুষের ‘শত্রুবিদ্বেষী ও ঐতিহাসিক উপস্থিতি’র জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মোজতবা খামেনি।
ইমাম রেজার মাজারে দাফন ও নতুন নেতার রহস্যময় অনুপস্থিতি
গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই, ২০২৬) ব্যাপক রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদে অবস্থিত দেশটির সবচেয়ে পবিত্রতম স্থান ‘ইমাম রেজার মাজারে’ চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। তবে অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, সপ্তাহব্যাপী চলা এই বিশাল জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়ার মূল পর্বেও সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না খামেনির ছেলে তথা ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি। পুরো শোক আয়োজনে তাঁর এই অনুপস্থিতি সাধারণ ইরানিদের মনে গভীর রহস্য ও নানাবিধ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
| প্রয়াত নেতার শেষ বিদায়ের রূপরেখা | নতুন সর্বোচ্চ নেতার বর্তমান পরিস্থিতি ও শারীরিক অবস্থা (২০২৬) |
| দাফনের স্থান | উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরের পবিত্র ইমাম রেজার মাজার। |
| যৌথ শোক মিছিল | ইরানের তেহরান, মাশহাদ এবং ইরাকের পবিত্র নাজাফ ও কারবালা শহর। |
| শারীরিক আঘাত | গত ফেব্রুয়ারির হামলায় মোজতবা খামেনির মুখমণ্ডল ও দুই পা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। |
| নিরাপত্তা সতর্কতা | মার্কিন বাহিনীর পুনঃহামলা ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা সেবা কর্তৃক উপস্থিতি গোপন রাখার সিদ্ধান্ত। |
আড়ালে থাকার মূল কারণ: গুরুতর চোট ও মার্কিন হামলার শঙ্কা
গোয়েন্দা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত জটিলতার কারণেই মূলত যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শুরু থেকেই সম্পূর্ণ আড়ালে রাখা হয়েছে মোজতবা খামেনিকে। তেহরানের জ্যেষ্ঠ কৌশলগত সূত্রগুলো এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে তাঁর প্রকাশ্যে না আসার পেছনে দুটি প্রধান কারণ জানা গেছে:
- শারীরিক বিকৃতি ও চোট: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় বাবার মৃত্যু হলেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান মোজতবা। তবে সেই ভয়াবহ হামলায় তাঁর মুখমণ্ডলে গুরুতর বিকৃতি এসেছে এবং দুই পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বর্তমানে চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে সেরে উঠছেন, তবে এখনো সাধারণ মানুষের সামনে আসার মতো শারীরিক অবস্থায় পৌঁছাননি।
- পুনঃহামলার শঙ্কা: মার্কিন সামরিক বাহিনী বা মোসাদ আবারও সুনির্দিষ্ট টার্গেটে ড্রোন হামলা চালাতে পারে—এমন তীব্র শঙ্কা থেকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা সেবা ও রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC) নতুন নেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁর অবস্থান ও উপস্থিতিকে কঠোরভাবে গোপন রাখছে।
ফেব্রুয়ারির সেই বিধ্বংসী হামলার পর থেকে আজ পর্যন্ত মোজতবা খামেনির নতুন কোনো ছবি, ভিডিও বা কণ্ঠস্বর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। এমন একটি যুদ্ধকালীন ও সংবেদনশীল সময়ে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন হলো, যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে এবং হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে নতুন করে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক ও কূটনৈতিক সংঘাতে জড়িয়েছে পারমাণবিক শক্তি অর্জনের দ্বারপ্রান্তে থাকা ইরান।
সূত্র: আল জাজিরা


















