দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের বাইরে নির্বাসিত থাকা বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন যে, সব ধরনের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং আইনি বাধা উপেক্ষা করে তিনি চলতি বছরই (২০২৬) বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন। ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি (NDTV)-কে দেওয়া এক বিশেষ ই-মেইল সাক্ষাৎকারে তিনি এই সুদৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। নির্বাসিত জীবনে থাকা শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেছেন, “দেশে ফেরা আমার ব্যক্তিগত কোনো ক্ষমতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়। বরং এটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং ঐতিহ্যবাহী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক লড়াই।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমি ক্ষমতার মোহে রাজনীতি করি না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই আমার এই সংগ্রাম এবং আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না।”
দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও মামলার বিষয়ে কঠোর অবস্থান
আওয়ামী লীগের ওপর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হাজারো মামলা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, “আওয়ামী লীগ কোনো কাগুজে সংগঠন বা ভুঁইফোড় দল নয়; এটি বাংলার রক্তস্নাত মাটি ও মানুষের ইতিহাস এবং আমাদের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে।” দীর্ঘ ৭৭ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে দলটি বারবার সামরিক জান্তা ও কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, প্রতিবারই আওয়ামী লীগ জনগণের শক্তিতে ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, কিছু চরম বাংলাদেশবিরোধী শক্তি বৈশ্বিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জনগণের একটি অংশকে সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত করে অবৈধভাবে ক্ষমতা পরিবর্তন করেছে। তবে মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগের আদর্শকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষ যেভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দলটির সমর্থনে রাজপথে নামছেন, তা আওয়ামী লীগের পুনর্জাগরণের স্পষ্ট লক্ষণ।
৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতি ও ব্যর্থ রাষ্ট্র বানানোর অপচেষ্টা
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, “ক্ষমতা পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের মূল ভিত্তি—জাতীয়তাবাদ, বহুমাত্রিক গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর সরাসরি আঘাত হানা হয়েছে।” মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন ও জাদুঘর ধ্বংস, জাতীয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’ নিষিদ্ধকরণ এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হচ্ছে। তাঁর মতে, এই ধরনের অরাজকতা ও সুপরিকল্পিত মব-সন্ত্রাস বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার গভীর অপচেষ্টার অংশ ছাড়া আর কিছুই নয়।
গোপন সমঝোতার গুঞ্জন নাকচ ও সংগ্রামের ঘোষণা
সমসাময়িক রাজনীতিতে দেশের অন্য কোনো বড় রাজনৈতিক শক্তির (যেমন বিএনপি) সঙ্গে ব্যাকডোর বা গোপন সমঝোতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসিত হচ্ছে—এমন সব গুঞ্জনকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আওয়ামী লীগ কারও রাজনৈতিক দয়া বা দাক্ষিণ্য ভিক্ষা চায় না। গণতন্ত্র এবং জনগণের পবিত্র ভোটাধিকার কোনো গোপন দর-কষাকষির বিষয় নয়; এগুলো এ দেশের মানুষের সাংবিধানিক অধিকার।” বর্তমানে ভারতে অবস্থান করলেও তাঁর মন ও প্রাণ সার্বক্ষণিক বাংলাদেশে পড়ে আছে জানিয়ে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “টুঙ্গিপাড়ায় বাবার সমাধি এবং প্রিয় দেশবাসীর কথা ভেবে আমি প্রতিটি মুহূর্ত চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে পার করি। তবে আমি শেষ দিন পর্যন্ত স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এ দেশের মানুষ আবারও তাদের লুণ্ঠিত গণতন্ত্র ফিরে পাবে এবং আওয়ামী লীগ জনগণের শক্তির ওপর ভর করেই রাজপথে ঘুরে দাঁড়াবে।”



















