প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চারদিনের বেইজিং সফরের তৃতীয় দিনে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিনিয়োগ সহযোগিতা ও সবুজ উন্নয়নসহ (গ্রিন ডেভেলপমেন্ট) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক সফল উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে উভয় দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এসব চুক্তি সই হয়। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আজ শুক্রবার সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হবেন।
লালগালিচা সংবর্ধনা, তোপধ্বনি ও গার্ড অব অনার
গতকাল দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আগে বেইজিংয়ের গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উষ্ণ ও রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা জানান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। শুভেচ্ছা বিনিময় এবং দুই দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরিচয় পর্বের পর প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা বিছানো অভিবাদন মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চীনের সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকশ দল দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীকে সুসজ্জিত সশস্ত্র সালাম (গার্ড অব অনার) প্রদর্শন করে। এ সময় দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয় এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান জানিয়ে ঐতিহ্যবাহী তোপধ্বনি দেওয়া হয়। এরপর দুই প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর দৃষ্টিনন্দন প্যারেড পরিদর্শন করেন।
কৌশলগত আস্থা ও এক-চীন নীতির প্রতি দৃঢ় সমর্থন
চীনা রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং বলেন, “কৌশলগত পারস্পরিক আস্থা সুদৃঢ় করতে, বাস্তবমুখী সহযোগিতা সম্প্রসারণ করতে এবং উভয় দেশের জনগণের জন্য আরো বেশি সুফল বয়ে আনতে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চীন সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত রয়েছে।” তিনি বাংলাদেশকে একটি ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী উল্লেখ করে বলেন, নিজস্ব জাতীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন পথ অনুসরণের ক্ষেত্রে চীন দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশকে সমর্থন করে। চীন বাংলাদেশের সঙ্গে উচ্চমানের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ (BRI) সহযোগিতা এগিয়ে নিতে, বাংলাদেশ থেকে উন্নত মানের পণ্য আমদানি বাড়াতে এবং নতুন জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য-যোগাযোগের মতো উদীয়মান শিল্পখাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করতে আগ্রহী।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।” তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ সরকার ‘এক-চীন’ (One-China Policy) নীতিতে দৃঢ়ভাবে অবিচল এবং যেকোনো ধরনের ‘তাইওয়ান স্বাধীনতা’র ঘোর বিরোধী। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে চীনের দীর্ঘদিনের সহায়তার জন্য তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির পরে জানান, বৈঠকে চীন সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি তাদের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সমর্থনের কথা জানিয়েছে এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানেও বাংলাদেশের পাশে থাকার দৃঢ় আশ্বাস দিয়েছে।
যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হলো
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মূলত বিনিয়োগ, শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সমঝোতা স্মারকগুলো সই হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- বিনিয়োগ ও উদীয়মান খাত: গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (GDI)-এর অধীনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন সম্পর্কিত সমঝোতা স্মারক এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে একটি কো-অপারেশন প্ল্যান।
- কৃষি ও রপ্তানি: বাংলাদেশ থেকে চীনে সরাসরি ‘কাঁঠাল রপ্তানি’ সংক্রান্ত একটি বিশেষ সমঝোতা স্মারক।
- শিক্ষা ও প্রযুক্তি: টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশনে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতায় দুটি পৃথক চুক্তি।
- গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তি: গণমাধ্যম খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধির লক্ষ্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক।
চীনা ব্যবসায়ীদের প্রতি ‘পরবর্তী এশীয় অর্থনৈতিক বিস্ময়’-এর অংশীদার হওয়ার আহ্বান
বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পপতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে প্রধান অতিথির ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “বাংলাদেশ আপনাদের এশিয়ার পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময়ের অংশীদার হওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।”
বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করতে তাঁর সরকারের গৃহীত বৈপ্লবিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সরাসরি মোকাবিলা করতে একটি ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই সংস্কারের মাধ্যমে সরকারি পরিষেবাগুলোকে ডিজিটাইজ করা হচ্ছে এবং এর ফলে নতুন যেকোনো বিদেশী প্রতিষ্ঠান ১৫ দিনেরও কম সময়ে বাংলাদেশে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আইন অনুযায়ী বৈষম্যহীন সুবিধা, মূলধন ও লভ্যাংশ সরাসরি দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ এবং শক্তিশালী আইনি সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে বিশেষ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে এবং খুব শীঘ্রই চীনে বাংলাদেশের প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয় (ইনভেস্টমেন্ট অফিস) চালু করা হবে।
তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও সিপিসি নেতার সাথে সাক্ষাৎ
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী লি গোওইং এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং পৃথকভাবে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। পানিসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর অববাহিকা ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ড্রেজিং ও নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে ঐকমত্য হয়। অন্যদিকে, সিপিসি নেতা লিউ হাইশিং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৯ বার চীন সফরের ঐতিহাসিক লিগ্যাসি স্মরণ করে জানান, তাঁর সম্মানে ২০০১ সালের সফরের ছবি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই রাজনৈতিক লিগ্যাসি অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলাদেশে ‘চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল’ নির্মাণে চীনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।
আজ শি জিনপিং-তারেক রহমান শীর্ষ বৈঠক
সফরের শেষ দিন আজ শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে শীর্ষ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে দুই দেশের বিনিয়োগের পরিধি বৃদ্ধি ও কৌশলগত রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এরপর প্রধানমন্ত্রী ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ন্যাশনাল স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং চীনের জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শন করবেন। সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করবেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর উচ্চপর্যায়ের সফরসঙ্গীরা।
সূত্র: বাসস ও সিনহুয়া।


















