লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভায় একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে মা ও তাঁর দুই মেয়েসহ মোট তিনজনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মেধাবী ছাত্রী এবং অপরজন নয় বছরের শিশু। এই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে আরও এক কলেজছাত্রী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। এদিকে, এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে অন্তর মজুমদার নামের এক যুবককে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী গণপিটুনি দিলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে তাঁরও মৃত্যু হয়।
আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রায়পুর পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের গোডাউন রোড এলাকায় এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে উত্তেজিত জনতার ইটপাটকেলের আঘাতে অন্তত ৬ থেকে ৭ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
নিহত ও আহতদের পরিচয়
হৃদয়বিদারক এই ঘটনায় নিহত ও আহতরা হলেন:
- শাহিনুর বেগম (৩৮): নিহতদের মা। ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।
- সায়মা আক্তার (২১): শাহিনুর বেগমের বড় মেয়ে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
- শিফা আক্তার (৯): শাহিনুর বেগমের ছোট মেয়ে। মায়ের সাথেই ঘটনাস্থলে সে মারা যায়।
- ইকরা আক্তার (১৭): শাহিনুর বেগমের মেঝো মেয়ে এবং রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশে ধারাল অস্ত্রের গুরুতর আঘাত থাকায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) পাঠানো হয়েছে।
- অন্তর মজুমদার (অভিযুক্ত যুবক): নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচরের কার্তিক মজুমদারের ছেলে। হত্যাকাণ্ডের পর জনরোষের মুখে গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হয়ে সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
নিহতদের আদি বাড়ি কুমিল্লা জেলায় হলেও ২০১৯ সালে তাঁদের বাবা কামাল হোসেন কেরোয়া গ্রামে বিদ্যুৎস্পর্শে মারা যাওয়ার পর থেকে মা শাহীনুর বেগম তাঁর ৩ মেয়ে ও ১ ছেলেকে নিয়ে রায়পুরের এই ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছিলেন।
ঘটনার বিবরণ ও তপ্ত পরিস্থিতি
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকালে ওই যুবক আচমকা ধারাল অস্ত্র নিয়ে শাহীনুর বেগমের ভাড়া বাসায় ঢুকে মা ও তিন বোনকে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে। চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে ঘটনাস্থলেই মা ও ছোট মেয়ের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। অপর দুই বোনকে উদ্ধার করে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে বড় মেয়ে ঢাবি ছাত্রী সায়মাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
এদিকে, এই নৃশংসতা দেখে স্থানীয় উত্তেজিত জনতা ঘাতক যুবককে ধরে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে পাঠালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকেও মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর পর উত্তেজিত জনতা পুলিশের ওপর চড়াও হয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে সহকারী পুলিশ সুপার (রায়পুর সার্কেল) মো. আব্দুর রাশেদসহ পুলিশের ৬-৭ জন সদস্য আহত হন।
তদন্তে পুলিশ প্রশাসন
খবর পেয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার আবু তারেক দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বাহারুল আলম জানান, নিহত ও আহত সবার শরীরেই ধারাল অস্ত্রের গভীর ও নৃশংস আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার আবু তারেক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ৪ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে কী কারণে বা কোনো পূর্বশত্রুতার জেরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তা এখনো উদঘাটিত হয়নি। রহস্য উদঘাটনে পুলিশের একাধিক টিম তদন্ত শুরু করেছে।



















