শুক্রবার (১২ জুন) দেশের প্রধান প্রধান ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট নিয়ে গণমাধ্যমে তাঁদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন。 ব্যবসায়ী নেতারা এটিকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম সাহসী ও সংস্কারমুখী বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করলেও এর বাস্তবায়নকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন。 নেতাদের মতে, অতীতে অনেক ভালো বাজেটও সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে, তাই অর্থবছর শুরুর প্রথম দিন থেকেই বাস্তবমুখী পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। বাজেটে স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা এবং ব্যবসা সহজীকরণের ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, বিদ্যুৎ ও তীব্র জ্বালানি সংকট সমাধানের কোনো কার্যকর রূপরেখা না থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উদ্যোক্তারা。
বিসিআই সভাপতি: বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংস্কারমুখী বাজেট
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডিজিট্রজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ প্রস্তাবিত বাজেটকে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংস্কারমুখী ও ব্যবসাবান্ধব হিসেবে অভিহিত করেছেন:
- বাজেটের আকার: বর্তমান বিশাল জনসংখ্যার দেশের জন্য এ ধরনের বড় বাজেটের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
- অর্থনৈতিক সংস্কার: বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মাঝে ব্যাংকিং খাত, কর ব্যবস্থা এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের অঙ্গীকার দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প: বন্ধ কলকারখানা চালুসহ এসএমই (SME) খাতের জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রয়েছে।
- নতুন সম্ভাবনা: বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে কাজে লাগাতে রপ্তানি বহুমুখীকরণে হালাল পণ্য যুক্ত করা এবং ক্রিয়েটিভ ও সুনীল অর্থনীতিকে (Blue Economy) গুরুত্ব দেওয়া টেকসই উন্নয়নে সহায়ক হবে।
বিটিএমএ সভাপতি: প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতের সম্ভাবনা ও উদ্বেগ
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বাজেটে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে টেক্সটাইল শিল্পের কিছু চলমান সংকট আমলে না নেওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন:
- করপোরেট ট্যাক্স: দেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতের বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় করপোরেট ট্যাক্সের হার ১৫ শতাংশ নির্ধারণের দাবি জানানো হলেও বাজেটে তা প্রতিফলিত হয়নি。
- কাঁচামাল আমদানি: ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান ৩০% মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত দেশীয় শিল্পের জন্য ঝুঁকি ও অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
- উদ্যোক্তাদের চিন্তা: উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা এবং ১৩ থেকে ১৫ শতাংশের মতো ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পকে গভীর ঝুঁকিতে ফেলেছে。
বিকেএমইএ সভাপতি: পোশাক খাতের প্রত্যাশা পূরণ হলেও জ্বালানি শঙ্কা কাটেনি
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সংকটে থাকা ও বন্ধ কারখানার জন্য ঘোষিত সহায়তা কর্মসূচিকে সন্তোষজনক বলেছেন। তৈরি পোশাকশিল্পের দুটি প্রধান প্রত্যাশা পূরণের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান:
- ইতিবাচক পদক্ষেপ: কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সোলার সিস্টেমের আমদানি সহজীকরণ পোশাক খাতের জন্য ইতিবাচক। নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি ও বন্ডেড প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহের সুযোগ রপ্তানি বৃদ্ধি করবে।
- পলিসি স্থিতিশীলতা: বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধার মেয়াদ ৩ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে।
- জ্বালানি প্রতিবন্ধকতা: তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। উচ্চ ঋণসুদের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় এই সুদে ব্যবসা চালানো অসম্ভব।
অ্যামচ্যাম সভাপতি: রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী, প্রয়োজন সুশাসন
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচ্যাম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ মানবসম্পদ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন。 তবে তিনি সামগ্রিক সেবার মান ও সুশাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান:
- ঋণ ও বিনিয়োগ: জিডিপির ৩.৫৫ শতাংশ বাজেট ঘাটতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য হলেও তা পূরণে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর সরকারের অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দেবে এবং বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
- কর ব্যবস্থা: রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী উল্লেখ করে তিনি করের হার বাড়ানোর চেয়ে করের আওতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল কর ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে করদাতাবান্ধব পরিবেশ তৈরির পরামর্শ দেন।
- এডিপি ও অবকাঠামো: বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদারকি ও ব্যয় বৃদ্ধি রোধে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।



















