আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার একটি ‘ছায়া বাজেট প্রস্তাবনা’ পেশ করেছে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এই প্রস্তাবিত ছায়ায় বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৩ ৫৭৯ কোটি টাকা। মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পক্ষ থেকে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাজেট প্রস্তাবনা জনগণের সামনে উপস্থাপন করেন। বাজেট পেশকালে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন এবং অর্থনৈতিক জবাবদিহিতা নিয়ে দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও গণভোটের রায় নিয়ে আমিরের সমালোচনা
বাজেট উপস্থাপনকালে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন:
- জনগণের আস্থা সংকট: তিনি বলেন, আমরা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েই সংসদে গিয়েছিলাম। দেশে দুটি ভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু তারা একটির শপথ নিলেন আর অন্যটির নিলেন না। তারা গণভোটকে সরাসরি অস্বীকার করেছেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যদি এভাবে জনগণকে ধোঁকা দেন, তবে মানুষের আস্থা থাকবে কীভাবে?
- জনগণকে অপমান: তিনি অভিযোগ করেন, দুই-তৃতীয়াংশের জোরে বর্তমান সরকার আমাদের যৌক্তিক দাবি অগ্রাহ্য করে দেশের জনগণকে স্পষ্ট অপমান করেছে। গণভোটের রায় ব্যর্থ হওয়ার কোনো আইনি বা ঐতিহাসিক দলিল কোথাও নেই, কিন্তু এবারই প্রথম এমন বিপত্তি ঘটলো।
- সব ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ: জামায়াত আমির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা পূর্বে যে ধরনের আশঙ্কা করেছিলাম, এখন সমাজে ঠিক তা-ই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশের আর্থিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সাংবাদিকতাসহ সমস্ত জায়গায় আজকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দৃশ্যমান এবং সমাজের অপরাধী লোকদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সততা, জবাবদিহিতা ও অর্থবছর পরিবর্তনের প্রস্তাব
জামায়াতে ইসলামী এই বাজেটকে কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, বরং দেশের ১৮ থেকে ২০ কোটি মানুষের সার্বিক কল্যাণের কথা বিবেচনা করে প্রণয়ন করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট জানান যে, এই বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান শর্ত হলো সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা। রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি একাউন্টেবিলিটি (জবাবদিহিতা) না থাকে, তবে সরকার যে বাজেটই দিক না কেন, তা মাঠে বাস্তবায়ন করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
পাশাপাশি, দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের নামে অর্থ লোপাটের সংস্কৃতি বন্ধ করতে অর্থবছরের সময়সীমা পরিবর্তনের একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব দেন জামায়াত আমির:
- উন্নয়নের নামে গণলুটপাট: তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের বর্তমান অর্থবছর (ফিসকাল ইয়ার) হলো জুলাই থেকে জুন। কিন্তু জুন মাস সাধারণত দেশে বর্ষা, খরা কিংবা সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত থাকে। আমরা লক্ষ্য করি যে, এডিপির একটি বিশাল অংশ বছরের শেষ দুই মাসে তাড়াহুড়ো করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়, যা মূলত কোনো প্রকৃত বাস্তবায়ন নয়—এটি আসলে ‘গণলুটপাট’। এর কোনো সুফল সাধারণ জনগণ পায় না।
- ক্যালেন্ডার ইয়ারের সঙ্গে সমন্বয়: এই অপচয় ও অনিয়ম রোধে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সংসদে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হবে যাতে বাংলাদেশের অর্থবছরকে প্রচলিত ক্যালেন্ডার ইয়ারের (জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর) সঙ্গে মিলিয়ে পুনর্নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে বছরের শেষভাগের বাজেট বা টাকা আর বর্ষার পানিতে ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাবে না এবং জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।



















