২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশের আনুষ্ঠানিকতার আগেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বা নবম পে-স্কেল. একদিকে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার একটি বিস্তারিত ‘ছায়া বাজেট’ পেশ করে নিজস্ব প্রস্তাবনা দিয়েছে, অন্যদিকে বর্তমান সরকারও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রাথমিক ও কৌশলগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে. গত মঙ্গলবার (৯ জুন) রাজধানীর মগবাজারে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামী তাদের এই প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটের মূল রূপরেখা ও সুপারিশমালা গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরে.
জামায়াতে ইসলামীর ছায়া বাজেট ও বেতন কাঠামোর সুপারিশ
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে পেশ করা ছায়া বাজেটে মূল্যস্ফীতির এই কঠিন সময়ে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের একটি সুনির্দিষ্ট ফর্মুলা দেওয়া হয়েছে:
- ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড: নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের স্বস্তি দিতে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য প্রথম বছরেই নতুন স্কেলের শতভাগ (১০০%) মূল বেতন কার্যকর করার জোর সুপারিশ করা হয়েছে. তবে তাদের ভাতার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বছরে শতভাগ বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে.
- ১ম থেকে ৯ম গ্রেড: উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে মূল বেতন এককালীন না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে. এর মধ্যে প্রথম বছর ৫০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছর বাকি ৫০ শতাংশ মূল বেতন কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে. আর তাদের পূর্ণাঙ্গ ভাতার সুবিধা কার্যকরের প্রস্তাব রাখা হয়েছে তৃতীয় বছরে.
- ভাতা পুনঃনির্ধারণ: বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতি রেখে সরকারি কর্মচারীদের টিফিন ভাতা, যাতায়াত ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ও সন্তানদের শিক্ষা ভাতা নতুন করে সম্মানজনকভাবে পুনঃনির্ধারণের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে দলটি.
সরকারের প্রস্তুতি, বরাদ্দ ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা
আসন্ন বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের দাবি নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বড় ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে. সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী:
- বাজেট বরাদ্দ: নতুন এই পে-স্কেল আংশিক ও পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী বাজেটে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল বা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে.
- বাস্তবায়ন রোডম্যাপ: সরকার পরিকল্পনা করেছে আগামী জুলাই (২০২৬) থেকে আংশিকভাবে এই নতুন কাঠামো কার্যকর করার. এটি মূলত তিনটি অর্থবছর ধরে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে:১. প্রথম ধাপ (২০২৬-২৭ অর্থবছর): মূল বেতনের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি কার্যকর করা হবে.২. দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২৮ অর্থবছর): বাকি বর্ধিত মূল বেতন সমন্বয় করা হবে.৩. তৃতীয় ধাপ (২০২৮-২৯ অর্থবছর): অন্যান্য সকল সুযোগ-সুবিধা এবং নতুন ভাতা যুক্ত করে দেশজুড়ে পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে.
- বৈষম্য হ্রাস: নতুন পে-স্কেলে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের বিদ্যমান অনুপাত ১:৯.৪ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে ১:৮-এ আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বৈষম্য কমাতে ভূমিকা রাখবে.
প্রস্তাবিত নতুন বেতন স্কেলের সম্ভাব্য রূপরেখা
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেলের খসড়াতে বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতন প্রায় ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির আভাস পাওয়া যাচ্ছে. গ্রেডভিত্তিক সম্ভাব্য পরিবর্তনগুলো নিচে দেওয়া হলো:
| গ্রেডের বিবরণ | বর্তমান মূল বেতন | প্রস্তাবিত নতুন মূল বেতন |
| ২০তম গ্রেড (সর্বনিম্ন) | ৮,২৫০ টাকা | ২০,০০০ টাকা |
| ১ম গ্রেড (সর্বোচ্চ) | ৭৮,০০০ টাকা | ১,৬০,০০০ টাকা |
ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে সৃষ্ট বিরূপ প্রভাব যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে, তা জামায়াতে ইসলামী এবং সরকার উভয় পক্ষই স্বীকার করেছে. এই তীব্র অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখেই পে-স্কেল বাস্তবায়নে এককালীন বড় কোনো আর্থিক ধাক্কা না নিয়ে ধাপে ধাপে তা কার্যকর করার দূরদর্শী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে. সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন এবং সরকারি খাতের অপচয় রোধের মাধ্যমে নিজেদের ব্যয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করা. এই নতুন বেতন কাঠামো শেষ পর্যন্ত সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের লাখ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর জীবনযাত্রায় একটি ইতিবাচক ও যুগান্তকারী পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট মহল.



















