সততা, সংযম ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি সামনে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনায় কাজ শুরু করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। সরকারি ব্যয় কমানো, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ এবং সাধারণ মানুষের সুবিধা বাড়াতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাদাসিধে জীবনযাপন ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে সরকারের এসব উদ্যোগের মধ্যেই দলের তৃণমূলের কিছু নেতাকর্মীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।
চাঁদাবাজি, দখল, আধিপত্য বিস্তার, সংঘাত কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, নেতৃত্বের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডকে অনেক সময় মাঠপর্যায়ের ছোট ছোট ঘটনা আড়াল করে দিচ্ছে। এতে শুধু বিএনপির সাংগঠনিক ভাবমূর্তিই নয়, সরকারের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সাম্প্রতিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাকে এর একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবিরের এক নেতার সঙ্গে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরোধ তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের প্রতিক্রিয়া এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ নতুন বিতর্ক তৈরি করে। ফলে ঘটনার সূত্রপাত অন্য জায়গায় হলেও পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে জনপরিসরে দায়ের বড় অংশ ছাত্রদলের ওপরই পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিকভাবে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও পরিণত ও কৌশলী অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন ছিল বিএনপির।
এনসিপির নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাতেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। তার ওপর হামলার ঘটনায় বিএনপির নাম আলোচনায় আসায় রাজনৈতিকভাবে দলটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। তাদের মতে, পাটওয়ারীর কর্মসূচিতে বাধা না দিয়ে তাকে নির্বিঘ্নে কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেওয়া কিংবা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়াই বিএনপির জন্য তুলনামূলকভাবে কৌশলী অবস্থান হতে পারত। পালটা প্রতিক্রিয়ার ফলে বরং বিরোধীদের বিএনপিকে আক্রমণাত্মক হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী মনে করেন, অতীতে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনগুলোর মাধ্যমে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও সহিংস রাজনীতির নজির রয়েছে। নতুন বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ করছেন। তাই এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, মতভেদ বা সমস্যা থাকতেই পারে। কিন্তু লাঠিসোঁটা নিয়ে আক্রমণ কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো দল বা সংগঠনের অভিযোগ থাকলে তা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা উচিত, যাতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করা যায়।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় বিএনপির নেত্রী ও পদত্যাগী সংসদ-সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠজনদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও দলটির জন্য অস্বস্তি তৈরি করেছে। ইসিবি চত্বরে নিউ গিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেডে হামলা ও দখলচেষ্টার অভিযোগও রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন আরও কিছু ঘটনায় দলের নেতাকর্মীদের নাম জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে।
বিএনপির ভেতরেও এসব ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি কোনো ভুলকে ছোট করে দেখছে না এবং অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়নি। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তাদের আইনের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি দলের সংরক্ষিত আসনের একজন এমপির পদ কেড়ে নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধীর দলীয় পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।
প্রধানমন্ত্রীর বার্তার সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার ব্যবধান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কথা বলে আসছেন। বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন।
দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসিত থাকার পর দেশে ফেরার সময়ও তার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সংযমের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়। বড় ধরনের জনসভা বা সংবর্ধনার পরিবর্তে রাজধানীর বাইরে ৩০০ ফিট এলাকায় সংক্ষিপ্ত ও সুশৃঙ্খল উপস্থিতির মাধ্যমে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের বার্তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন নেতাকর্মীদের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ হয়—এমন কোনো কর্মকাণ্ড না করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল।
সরকারি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় পরামর্শক ব্যয় কমানো এবং সংসদ-সদস্যদের জন্য শুল্কমুক্ত বিলাসবহুল গাড়ি না নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তসহ রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের কারণে সরকারের প্রতি ইতিবাচক আলোচনা তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলের মত।
তবে এসব অর্জনের পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। কোনো নেতার বক্তব্য কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের একটি সংঘাতের ঘটনা মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে সরকারের বড় অর্জনগুলোও অনেক সময় আলোচনার আড়ালে চলে যাচ্ছে।
চাঁদাবাজি-দখলের অভিযোগেও অস্বস্তি
ক্ষমতায় আসার সাড়ে সাত মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে বিএনপির একটি অংশের বিরুদ্ধে। কোথাও স্থানীয় নেতাদের দ্বন্দ্ব, কোথাও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত এবং কোথাও দলের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের অভিযোগ এসেছে।
এসব ঘটনায় প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে জনমনে অস্বস্তি রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা এবং জুলাই অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ ও কাদা ছোড়াছুড়ির ঘটনাগুলো সেই ঐক্যের জায়গাকে দুর্বল করছে। এ পরিস্থিতির সুযোগ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও নিচ্ছে বলে তাদের মত।
তাদের মতে, বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর অনভিপ্রেত আচরণ বা ছোটখাটো ভুলও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার হচ্ছে। এতে দল ও সরকারের ভাবমূর্তিতে প্রভাব পড়ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো স্থিতিশীলতা ও জনআস্থা ধরে রাখা। আর সেই আস্থার সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীদের আচরণও সরাসরি যুক্ত।
‘পুরো দলকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলায় ফিরতে হবে’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদের মতে, সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে বিএনপির কিছুটা ক্ষতি হবে এবং দলের জনপ্রিয়তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
যুগান্তরকে তিনি বলেন, একজন নেতার পক্ষে একা পুরো দল সামলানো সম্ভব নয়। পুরো দলকে সাংগঠনিকভাবে শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনতে না পারলে দলের ক্ষতি হবে। গণ-অভ্যুত্থানের পর বর্তমান প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষ অনেক বেশি সোচ্চার এবং যেকোনো ঘটনার দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক কয়েকটি সাম্প্রতিক ঘটনা প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, এসব ঘটনা ছোটখাটো উসকানি। বিএনপি বা ছাত্রদল এসব উসকানিতে জড়িয়ে পড়লে তা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তার মতে, এসব বিষয় রাজনৈতিক, সাংগঠনিক এবং প্রয়োজনে আদর্শিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
তিনি বলেন, বিএনপি এখন সরকারে থাকায় তাদের দায়দায়িত্বও বেশি। তাই তাদের ধৈর্য, সংযম ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে হবে। সরকারকে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা হলে যতটা সম্ভব তা এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সের মতে, শিক্ষাঙ্গনসহ সর্বত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক শাসনের ফলে তৈরি দখলদারত্ব ও সংঘাতের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার কথা থাকলেও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় তার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, দায়িত্বহীন বক্তব্য এবং অসহনশীল আচরণ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে। অতিতুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবাইকে সচেতন হতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় দায় সরকারের।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, সরকার দায়িত্বশীল আচরণ না করলে সব দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই বর্তাবে, যা গণতান্ত্রিক পথচলাকে ব্যাহত করতে পারে। অতীতের রাজনৈতিক ভুল ও অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের ভুল সংশোধন এবং সহনশীলতার চর্চা জরুরি। তা না হলে চলমান অস্থিরতার সুযোগ বিভিন্ন পক্ষ নিতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক উদ্যোগের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও এখন বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জনগণের কাছে সরকারের মূল্যায়ন শুধু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করে না; স্থানীয় পর্যায়ে একজন নেতাকর্মীর আচরণও শেষ পর্যন্ত পুরো দল ও সরকারের ভাবমূর্তির অংশ হয়ে ওঠে


















