নারীদের ব্যাংক হিসাব খোলা বা ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষ জামিনদার কিংবা সহ-স্বাক্ষরকারী চাওয়ার প্রচলন বন্ধ করতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ধরনের শর্ত আরোপকে নিয়ন্ত্রক বিধি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জাতীয় নারী আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নির্দেশিকার খসড়া তৈরি করেছে। খসড়াটির ওপর আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জনসাধারণের মতামত চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় নারী ও অন্যান্য পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর আর্থিক সেবায় প্রবেশ সহজ করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
খসড়া নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, দেশের ৪৩ দশমিক ১ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, তাঁদের পুরুষ জামিনদার দিতে বলা হয়েছে। অথচ আইন বা নিয়ন্ত্রক বিধিতে এ ধরনের সাধারণ বাধ্যবাধকতা নেই। স্বামীর জাতীয় পরিচয়পত্র, স্বামীর নামে থাকা ইউটিলিটি বিলসহ অতিরিক্ত বা ‘ছায়া’ নথি চাওয়াকেও নারীদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবায় প্রবেশের অন্যতম বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অতিরিক্ত নথি চাওয়া যাবে না
প্রস্তাবিত নির্দেশনা অনুযায়ী, সরল কেওয়াইসি ও ই-কেওয়াইসির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকের নির্ধারিত ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তার বাইরে কোনো অতিরিক্ত নথি চাইতে পারবে না আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।
ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি ও পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শাখা, বুথ ও ব্রোকারেজ হাউসে গ্রাহকের অধিকারসংক্রান্ত নোটিস প্রদর্শন করতে হবে।
কোনো নারী গ্রাহকের ক্ষেত্রে পুরুষ ‘ছায়া জামিনদার’ চাওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হলে সেটিকে পরিপালনসংক্রান্ত লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করার প্রস্তাব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে।
ঋণ গ্রহণে বড় ব্যবধান
নারীদের আনুষ্ঠানিক ঋণপ্রাপ্তির হার বাড়ানোও খসড়া নির্দেশিকার অন্যতম লক্ষ্য। এতে উদ্ধৃত ন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন সার্ভে ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১৬ শতাংশ নারী আনুষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেন। বিপরীতে ৩৩ শতাংশ নারী অনানুষ্ঠানিক উৎসের ওপর নির্ভর করেন।
গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ হিসাবের মাত্র ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ নারীদের। একই সঙ্গে নারীদের গড় ঋণের পরিমাণ সাধারণত পুরুষদের তুলনায় তিন থেকে আট গুণ কম বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সামগ্রিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতেও নারী-পুরুষের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের হার ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবধান ৮ দশমিক ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট।
মোবাইল আর্থিক সেবায় ব্যবধান আরও বেশি। নারীদের অন্তর্ভুক্তির হার ৩৬ শতাংশ, বিপরীতে পুরুষদের ৫৬ দশমিক ৯ শতাংশ। সক্রিয় মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহারের হার নারীদের ক্ষেত্রে মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
নারী-কেন্দ্রিক ঋণপণ্যের প্রস্তাব
নারীদের ঋণপ্রাপ্তি বাড়াতে প্রতিটি আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে অন্তত একটি নারী-কেন্দ্রিক ঋণপণ্য চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এসব ঋণের ক্ষেত্রে স্থাবর সম্পত্তিকে প্রধান বা একমাত্র জামানত হিসেবে বাধ্যতামূলক না করার কথা বলা হয়েছে। ঋণ দেওয়ার সময় নগদ প্রবাহ, ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড এবং নারীদের ক্ষুদ্রঋণ পরিশোধের ইতিহাস বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিএমএসএমই ঋণের অন্তত ১৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা বা নারীর মালিকানাধীন ব্যবসায় দেওয়ার বিদ্যমান শর্তও বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নীতিতেও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ সুবিধা ও পুনঃঅর্থায়নের ব্যবস্থা রয়েছে।
এ ছাড়া সিএমএসএমই ঋণ কর্মকর্তাদের লিঙ্গ-সংবেদনশীল প্রশিক্ষণ এবং ঋণের ক্ষেত্রে ‘ছায়া জামিনদার’ চাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ডিজিটাল সেবায় নতুন ব্যবস্থা
ডিজিটাল আর্থিক সেবায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতেও কিছু বাধ্যবাধকতার প্রস্তাব করা হয়েছে। মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনে বাংলায় ভয়েস নির্দেশনা, গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনে ইউএসএসডি ও এসএমএস সুবিধা চালু রাখা এবং পুরুষের সহায়তা ছাড়া নারী গ্রাহক নিজেই হিসাব পরিচালনা করতে পারছেন কি না—তা পরিমাপ করার কথা বলা হয়েছে।
নারীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ বাড়াতে প্রতিটি শাখা বা আউটলেটে একজন নারী ফোকাল পয়েন্ট এবং ২৪ ঘণ্টার হটলাইন রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অভিযোগ সাত কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। ১৫ দিনের পরও নিষ্পত্তি না হওয়া অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে পাঠানোর প্রস্তাব রয়েছে।
তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
খসড়া নির্দেশিকা অনুযায়ী, আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিবছর ‘উইমেনস ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন অ্যাকশন প্ল্যান’ ও প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। নারী ও পুরুষের আর্থিক সেবায় অংশগ্রহণের তথ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
খসড়াটি পাঁচ বছরে তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপে তথ্য সংগ্রহ ও পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা, দ্বিতীয় ধাপে দেশব্যাপী বাস্তবায়ন এবং শেষ ধাপে পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নারী আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে ইতোমধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন ঋণ ও পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা চালু রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী মালিকানাধীন আমানত ও ঋণ হিসাবের সংখ্যাও বেড়েছে।
তবে নতুন জাতীয় নারী আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নির্দেশিকাটি এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। জনসাধারণের মতামত গ্রহণের পর প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা ও সংশোধন শেষে এটি চূড়ান্ত করা হবে।


















