বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম হয়ে এখনো সন্ধান মেলেনি—এমন ২৫০ জনের ঘটনায় একসঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। তালিকায় বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ বিভিন্ন সময়ে গুমের শিকার ব্যক্তিদের ঘটনা রয়েছে।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় একই ধরনের প্যাটার্ন পাওয়া যাওয়ায় গুমের ঘটনাগুলোকে ‘ব্যাপক ও পদ্ধতিগত’ অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ করতে পাঁচজন বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা কাজ করছেন। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২৫০ ব্যক্তির বিষয়ে সমন্বিত তদন্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে ট্রাইব্যুনালে দাখিলের চেষ্টা চলছে।
প্রসিকিউশন জানিয়েছে, ২০১১ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্টের আগপর্যন্ত গুমের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনে তিন শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে এর মধ্যে ২৫০টি ঘটনা একত্র করে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিটি গুমের ঘটনাকে আলাদা কাউন্ট ও অভিযোগ হিসেবে রাখা হবে এবং যার বিরুদ্ধে যে ধরনের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সে অনুযায়ী আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নির্ধারণ করা হবে।
ইতোমধ্যে তদন্তে গুমের শিকার ব্যক্তিদের কোথা থেকে, কবে এবং কীভাবে তুলে নেওয়া হয়েছিল, তার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য নেওয়ার পাশাপাশি গণশুনানি, সাক্ষ্য গ্রহণ, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের মতে, পৃথকভাবে বিচার না করে একই বিচারের আওতায় আনতে পারলে সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি গুমের ঘটনাগুলোর অভিন্ন প্যাটার্নও আদালতের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, গুমের মামলাগুলোর তদন্তে সময় লাগছে, কারণ অনেক ভুক্তভোগী এখনো ফিরে আসেননি এবং পরিকল্পিতভাবে তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, গুমের শিকার পরিবারগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর তাদের আবারও শুনানি নেওয়া হবে এবং এরপর প্রতি সপ্তাহে তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।
এদিকে গুমের পর যারা ফিরে এসেছেন, তাদের ঘটনাও আলাদাভাবে তদন্ত করছে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের গুমের ঘটনাও রয়েছে। তদন্ত সংস্থা ভারতের আদালতের নথি সংগ্রহ করেছে। এসব নথিতে ভুক্তভোগী, তাঁর পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক ও উদ্ধারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। এ মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম-নির্যাতন ও গুমের পর হত্যার অভিযোগে বর্তমানে তিনটি মামলার বিচার চলছে। এর মধ্যে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ২০০-এর বেশি গুম-খুনের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (জেআইসি) ও টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম-নির্যাতনের পৃথক মামলাও বিচারাধীন।
চলমান মামলাগুলোর সাক্ষ্যগ্রহণে গোপন বন্দিশালা, নির্যাতন এবং অপহরণের পর নিখোঁজ করে দেওয়ার নানা তথ্য উঠে আসছে। বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীকে গুমের ঘটনাও ট্রাইব্যুনালের সাক্ষ্যে এসেছে।
অন্যদিকে গুমের শিকার পরিবারগুলোর সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় ধীরগতির অভিযোগ করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে সব গুমের ঘটনা সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও বিচার করতে হবে।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, তাদের কাছে ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। যাচাইয়ের পর ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে প্রকৃত গুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ২৮২ জন বিভিন্ন মেয়াদে আটক থাকার পর ফিরে এসেছেন, ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ এবং ৩৬ জনের মরদেহ পরে উদ্ধার হয়েছে।
আজ ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। ২০১০ সালে জাতিসংঘ দিনটিকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা করে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধে আইনি কাঠামো তৈরির কথা জানিয়েছে সরকার।


















