সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো অবৈধ ঘোষণার পর এক তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়ায় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, আগামী দ্বাদশ বা পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবশ্যই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই, ২০২৬) দুপুরে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি সরকারের এই দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। সকালে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার পর রাজধানীতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে যে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতেই সরকারের পক্ষে আইনমন্ত্রী এই আনুষ্ঠানিক অবস্থান পরিষ্কার করলেন।
পঞ্চদশ সংশোধনী ছিল গণতন্ত্রের অন্তরায় ও ফ্যাসিজমের কৌশল
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আনা পঞ্চদশ সংশোধনীর তীব্র সমালোচনা করে একে দেশের মানুষের ওপর চাপানো একটি বোঝা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন:
- ফ্যাসিজম চিরস্থায়ী করার ছক: পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত করা ৭-ক ও ৭-খ অনুচ্ছেদ দুটি মূলত দেশে ফ্যাসিজম বা একনায়কতন্ত্রকে চিরস্থায়ী করার একটি আইনি কৌশল ছিল। আজকের রায়ে তা বাতিল হওয়ায় গণতন্ত্রের মুক্তি ঘটেছে।
- বিএনপির আন্দোলনের ফসল: আইনমন্ত্রী সগর্বে উল্লেখ করেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কোনো চাপিয়ে দেওয়া বিষয় নয়, এটি মূলত বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজপথের আন্দোলনের ফসল।”
- জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন: এই ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের অন্তত চারটি প্রধান প্রধান জন-আকাঙ্ক্ষা ও অধিকারের সরাসরি আইনি স্বীকৃতি মিলেছে।
জুলাই সনদকে প্রাধান্য দিয়ে সংবিধান সংশোধন ও সংসদীয় কমিটি গঠন
আইনমন্ত্রী জানান, সর্বোচ্চ আদালতের এই যুগান্তকারী রায় এবং গণমানুষের ইচ্ছাকে ধারণ করেই সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়াটি সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘সংসদীয় কমিটি’ গঠন করা হবে। এই কমিটি দেশের সকল স্তরের ও সব শ্রেণির মানুষের মতামত এবং সুপারিশ গ্রহণ করে একটি সর্বজনীন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সরকার বা নির্বাচনকালীন প্রশাসন হিসেবে এর নাম ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ নাকি ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ রাখা হবে, তা সাধারণ মানুষের মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত করা হবে।
| খাতের বিবরণ | গৃহীত পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ আইনি রূপরেখা |
| নির্বাচনকালীন ব্যবস্থা | আগামী সাধারণ নির্বাচন সম্পূর্ণ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হবে। |
| জুলাই সনদের বাস্তবায়ন | ঐতিহাসিক ‘জুলাই সনদ’-এর স্পিরিট বা চেতনাকে প্রাধান্য দিয়ে রায়ের ৫৪টি বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। |
| নতুন আইন প্রণয়ন | জাতীয় সংসদের আগামী আসন্ন অধিবেশনেই বহুল প্রতীক্ষিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ বিল আকারে উত্থাপন করা হবে। |
| জনমত জরিপ ও কমিটি | সকল দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংসদীয় কমিটি গঠন করে সংবিধানের রূপরেখা ঠিক করা হবে। |
আইনমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শেষে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে, সেই ‘জুলাই সনদ’-কে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েই সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয় সকল আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বর্তমান সরকার। কোনো স্বৈরাচারী ধারা যেন আর কখনো দেশের মানুষের ওপর চেপে বসতে না পারে, সে বিষয়ে সরকার সম্পূর্ণ সজাগ রয়েছে।


















