বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মিত ‘মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় এবং নির্মাণশৈলী নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এর সামগ্রিক আর্থিক ও কারিগরি অনিয়মের বিষয়ে আজই উচ্চপর্যায়ের তদন্ত পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। আজ সোমবার (১৩ জুলাই, ২০২৬) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২৩তম দিনে বিরোধীদলীয় প্রবীণ সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিন ফারুকের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘোষণা দেন। অধিবেশনে ধর্মমন্ত্রীর পক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন এই জবাব দিচ্ছিলেন, তখন স্পিকারের আসনে সভাপতিত্ব করছিলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে যে মসজিদের নির্মাণ ব্যয় ১৩ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল, তা পরবর্তীতে কীভাবে ২১ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকল?
সংসদে প্রশ্ন করতে দাঁড়িয়ে সাবেক চিফ হুইপ জয়নাল আবদিন ফারুক বলেন, “দেশে এখন নতুন কোনো মডেল মসজিদের দরকার নাই। যারা অতীতে এই প্রকল্পের ব্যয় ১৩ কোটি থেকে বাড়িয়ে ২১ কোটি করেছে, আগে সেই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা দরকার। বহু জায়গায় নির্মিত সব মসজিদ এখনই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আমার নির্বাচনী এলাকা সেনবাগের মডেল মসজিদে বৃষ্টির দিনে ঢোকা যায় না, উপর থেকে অনবরত পানি পড়ে। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত করে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা, তা আমি জানতে চাই।” জয়নাল আবদিন ফারুকের এই বক্তব্যের পর ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালও নিজ এলাকার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, “আপনার সেনবাগে যে অবস্থা, আমার দুর্গাপুরে পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ। সেখানে একটি বিরাট পুকুরের পেছনে মডেল মসজিদ করা হয়েছে, যেখানে যেতে হলে এখন নতুন করে ব্রিজ করতে হবে। মসজিদটি সাধারণ মানুষ ব্যবহারই করতে পারছে না, তাই স্থানীয় লোকজন ব্যঙ্গ করে এর নাম দিয়েছে ‘দুর্গাপুরের তাজমহল’।”
মেগা প্রকল্পে মেগা দুর্নীতি ও শ্বেতপত্রের তথ্য
সংসদ সদস্যদের এই যৌক্তিক ও মাঠপর্যায়ের অভিযোগের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বিগত সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর দুর্নীতির ধরন ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন:
“বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে মূলত অর্থ লুটপাটের উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ও অতিরিক্ত বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছিল। ইসলামের নামে কিংবা পবিত্র মসজিদের নামে তারা যে ধরনের আর্থিক অনিয়ম করেছে, তা অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ। মডেল মসজিদ নির্মাণ অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ ছিল, কিন্তু এর প্রকল্প ব্যয় ও প্রাক্কলন (Estimation) যে যথাযথ ছিল না, তা আজ প্রমাণিত। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে প্রকাশিত ‘অর্থনীতির শ্বেতপত্র’ (White Paper)-এ স্পষ্ট এসেছে যে, বাংলাদেশে মেগা প্রকল্পে মেগা দুর্নীতির জন্যই আগে থেকে মেগা বাজেট সাজানো হতো।”
তদন্তের মূল পরিধি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে স্পষ্ট করেন যে, দুর্নীতি করার জন্য লুটপাটকারীরা প্রাক্কলিত ব্যয়ের মধ্যেই আগে ঢুকে পড়েছিল। এরপর ইচ্ছাকৃতভাবে সময় বৃদ্ধি করে ৫ বছরের প্রকল্পকে ৭ বছর করা হয়েছে এবং তার ওপর ভিত্তি করে কয়েক গুণ ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই জালিয়াতি রুখতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
| তদন্তের মূল বিষয়সমূহ | বর্তমান পরিস্থিতি ও অভিযোগ (২০২৬) | গৃহীত আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ |
| ব্যয় বৃদ্ধির রহস্য | প্রতি মসজিদের প্রাথমিক ব্যয় ১৩ কোটি থেকে ২১ কোটিতে রূপান্তর। | আজই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ। |
| মোট প্রকল্পের হিসাব | দেশব্যাপী সর্বমোট কতটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে এবং মোট ব্যয় কত। | মসজিদ-ওয়ারী (মসজিদ ভিত্তিক) সুনির্দিষ্ট অডিট পরিচালনা। |
| অবকাঠামোগত ত্রুটি | সেনবাগে ছাদ চুইয়ে পানি পড়া এবং দুর্গাপুরে প্রবেশ অযোগ্যতা। | প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সরকারি তদন্ত সংস্থাকে যুক্ত করা। |
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ জোর দিয়ে বলেন, সারা দেশে কতটি মডেল মসজিদ করা হয়েছে, মোট প্রকল্প ব্যয় কত ছিল এবং প্রতিটি মসজিদের খাতওয়ারী খরচ কেমন হয়েছে—তা নিখুঁতভাবে তদন্ত করতে আজই মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হবে। এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় আর্থিক অনিয়ম খতিয়ে দেখতে সরকারের অন্যান্য সংস্থাকেও যুক্ত করা হতে পারে এবং দোষী সাব্যস্ত আমলা, প্রকৌশলী বা ঠিকাদারদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।


















