বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি আরও ঘনীভূত হয়ে সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হওয়ায় দেশের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা এবং নদনদীগুলোতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এবং তৎসংলগ্ন উত্তর ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত এই লঘুচাপের কারণে কুয়াকাটাসহ সংলগ্ন সাগর প্রচণ্ড উত্তাল রয়েছে এবং বিশাল বিশাল ঢেউ তীরে আছড়ে পড়ছে। সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে যেকোনো সময় তীব্র ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দেশের চার সমুদ্রবন্দর—চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা ও কক্সবাজারকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বৈরী আবহাওয়ার কারণে গভীর সমুদ্রে টিকতে না পেরে শত শত ট্রলার নিয়ে জেলেরা উপকূলীয় মৎস্যবন্দর আলিপুর-মহিপুর আড়তঘাটে ফিরে এসেছেন।
তাপমাত্রা হ্রাসের সম্ভাবনা ও ৫ দিন ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তর গতকাল সন্ধ্যায় জানিয়েছে, সুস্পষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে দেশে চলমান বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিরাজমান তাপপ্রবাহ প্রশমিত বা কমে আসতে পারে। তবে আগামী পাঁচ দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। ইতিমধ্যেই গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের অভ্যন্তরীণ সিলেট বিভাগ এবং ভারতের ত্রিপুরা প্রদেশে ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারসমূহকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে অত্যন্ত সাবধানে চলাচল করতে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রধান নদনদীর পানিসমতল পরিস্থিতি ও গাইবান্ধার আপডেট
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরীণ ও উজানের অববাহিকায় টানা ভারী বৃষ্টির কারণে প্রধান প্রধান নদনদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, এই মুহূর্তে দেশে বড় ধরনের বন্যার কোনো আভাস নেই এবং সব নদীই বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিভিন্ন নদী অববাহিকার বর্তমান চিত্র নিম্নরূপ:
- ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকা: গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গার পানি বেড়েছে। আগামী ১-২ দিন এই নদীগুলোর পানি আরও বাড়তে পারে। পদ্মার পানি বর্তমানে স্থিতিশীল থাকলেও আগামী পাঁচ দিন তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে যমুনা নদীর পানি স্থিতিশীল রয়েছে।
- সুরমা-কুশিয়ারা ও আপার মেঘনা: উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই নদীগুলোর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় কিছুটা কমলেও আগামী দুই দিন তা পুনরায় বৃদ্ধি পেতে পারে।
- চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ: গত ২৪ ঘণ্টায় মুহুরী, গোমতী, ফেনী ও মনু নদের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। হালদা, সাঙ্গু, ধলাই ও খোয়াইসহ অন্যান্য নদীর পানি হ্রাস পেলেও আগামী ২-৩ দিনের মধ্যে এগুলোর পানিসমতল দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
- রংপুর বিভাগ: উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারের পানি গত ২৪ ঘণ্টায় হ্রাস পেয়েছে এবং আগামী তিন দিনও এই হ্রাস পাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে।
- গাইবান্ধা জেলা: স্থানীয় প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে করতোয়া নদীর পানি কমেছে। জেলা পাউবোর বেলা ৩টার তথ্য অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্রের পানি ৬ সেমি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১১০ সেমি নিচে এবং ঘাঘট নদের পানি ১ সেমি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১৬৫ সেমি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সাগর উত্তাল: মৎস্যবন্দরে নোঙর করেছে শত শত ট্রলার
সাগর প্রচণ্ড উত্তাল থাকায় এবং ঢেউয়ের তোড়ে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়ায় গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত অধিকাংশ মাছ ধরার ট্রলার জাল গুটিয়ে তীরে ফিরে এসেছে। পটুয়াখালীর মহিপুর মৎস্য আড়ত মালিক সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি দিদার উদ্দিন আহম্মেদ মাসুম জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগরে টিকতে না পেরে শত শত ট্রলার ঘাটে ফিরে এসেছে। আশাখালী মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে নোঙর করে থাকা ট্রলারের জেলে আবুল মিয়া ও সৈয়দ মাঝি আক্ষেপ করে জানান, এমনিতেই এ বছর সমুদ্রে তেমন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না, তার ওপর সাগরে প্রচণ্ড বড় বড় ঢেউয়ের কারণে জাল গুটিয়ে মহিপুরে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন তারা।



















