যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চরম সামরিক উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই দেশে এক ব্যতিক্রমী ও অভূতপূর্ব গণবিয়ের আয়োজন করেছে ইরান সরকার। তবে এই রাজকীয় বিয়ের নেপথ্যে রয়েছে এক গভীর জাতীয়তাবাদী ও সামরিক উদ্দেশ্য। এই বিয়েতে অংশ নেওয়া শত শত বর-কনে আসলে দেশের জন্য যেকোনো মুহূর্তে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত। মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনমনীয় যুদ্ধংদেহী মনোভাব ও হুমকির মুখে দেশের সাধারণ নাগরিক এবং তরুণদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে ইরান সরকারের বিশেষ প্রচারণামূলক কর্মসূচি ‘জানফাদা’-এর অংশ হিসেবে সোমবার (১৮ মে) রাতে এই বিশাল গণবিয়ের আয়োজন করা হয়। রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চত্বর ও স্কয়ারে একযোগে এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়, যা দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে।
‘মানব ঢাল’ হওয়ার অঙ্গীকার ও জানফাদা কর্মসূচি: ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ফার্সি শব্দ ‘জানফাদা’ (Jan-Fada)-এর বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘আত্মোৎসর্গ’ বা দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা। এই কর্মসূচির মূলমন্ত্র হলো—যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি ইরানের কোনো কৌশলগত স্থাপনা, পারমাণবিক কেন্দ্র কিংবা সাধারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তবে এই নবদম্পতিরাসহ নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবকেরা ওই কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে ‘মানব ঢাল’ (Human Shield) হিসেবে নিজেদের আত্মনিয়োগ করবেন। তেহরানের ইমাম হোসেন স্কয়ারেই একযোগে শতাধিক যুগলের বিয়ে সম্পন্ন হয়। ইরান সরকারের দাবি, এই দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের জাতীয়তাবাদী কর্মসূচিতে ইতিমধ্যেই দেশটির লাখ লাখ তরুণ-তরুণী ও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাম নিবন্ধন করেছেন, যার মধ্যে স্বয়ং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও সংহতি প্রকাশ করেছেন।
‘জানফাদা’ গণবিয়ের মূল রূপরেখা:
┌─────────────────────────┐ ┌─────────────────────────┐ ┌─────────────────────────┐
│ ১,০০০ জোড়া তরুণ-তরুণী │ ───> │ মেশিনগানবাহী জিপে চড়ে │ ───> │ কৌশলগত স্থাপনা রক্ষায় │
│ একযোগে বিবাহ বন্ধনে │ │ বিবাহ আসরে নবদম্পতি │ │ ‘মানব ঢাল’ হওয়ার শপথ │
└─────────────────────────┘ └─────────────────────────┘ └─────────────────────────┘
সামরিক আবহ বনাম বিয়ের রঙিন উৎসব: সোমবার রাতের বিয়ের মূল অনুষ্ঠানটি একদিকে যেমন ছিল যুদ্ধকালীন কঠোর আবহে ঘেরা, অন্যদিকে তেমনি ছিল উৎসবমুখর। ইমাম হোসেন স্কয়ারে বর-কনেরা সাধারণ কোনো প্রাইভেটকার বা রাজকীয় পালকিতে নয়, বরং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর ভারী মেশিনগান বসানো ও ফুল দিয়ে সাজানো সামরিক জিপ গাড়িতে চড়ে অনুষ্ঠানস্থলে হাজির হন। তবে যুদ্ধংদেহী আবহ থাকলেও বিয়ের মূল মঞ্চটি রঙিন বেলুন ও আলোকসজ্জা দিয়ে বেশ জাঁকজমকপূর্ণ করে সাজানো হয়েছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কনের পোশাক পরিহিত এক তরুণী পরিচয় গোপন রাখার শর্তে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, “দেশ এখন একটি কঠিন যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা নিশ্চিত, তবে এর মধ্যেও আমাদের মতো তরুণ-তরুণীদের নতুন জীবন শুরু করার ও বিয়ের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।”
উপস্থিত এক বর দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আমি যখন জানফাদাতে নাম লিখিয়েছিলাম, তখন আমার হবু স্ত্রীর সাথে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আমি তাকে স্পষ্ট বলেছি—এই স্বাধীন দেশটা টিকলে তবেই আমাদের ভালোবাসা টিকবে। তাই মাতৃভূমির প্রয়োজনে আমি যেকোনো মুহূর্তে হাসিমুখে জীবন দিতে প্রস্তুত।” অনুষ্ঠানস্থলে নবদম্পতিরা হাতে গোলাপ ফুল নিয়ে হাসিমুখে সেলফি তোলেন এবং বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সুসজ্জিত ট্রাকে চড়ে বিদায় নেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরানি কর্তৃপক্ষ দেশের অভ্যন্তরে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখতে এবং সরকারের প্রতি বিশ্বস্ততা প্রমাণে প্রায় প্রতিদিনই এমন বড় বড় গণসমাবেশ ও প্রতীকী কর্মসূচির আয়োজন করছে, যার সর্বশেষ উদাহরণ তেহরানের এই ঐতিহাসিক গণবিয়ে।



















