ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দেশের অর্থনৈতিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থ দ্রুত দেশে ফেরত আনার বিষয়ে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের করভার লাঘব, কালো টাকা সাদা করার বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার এবং দেশীয় শিল্প ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষার প্রসারে একাধিক জনবান্ধব সংশোধনী প্রস্তাব এনেছেন তিনি। সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব যুগান্তকারী প্রস্তাব তুলে ধরেন। তাঁর এই গণমুখী ও ব্যবসায়ীবান্ধব প্রস্তাবনাগুলো উপস্থাপনের সময় সংসদে সরকারি ও বিরোধীদলের সদস্যরা একযোগে টেবিল চাপড়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান।
করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি ও কালো টাকা সাদা করার বিধান প্রত্যাহার
প্রধানমন্ত্রী সাধারণ ও মধ্যবিত্ত করদাতাদের স্বস্তি দিতে ব্যক্তি করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ধাপে ধাপে আরও বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ কর বছরের জন্য ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হলেও প্রধানমন্ত্রী তা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার অনুরোধ জানান। একইভাবে ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ কর বছরের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ কর বছরের জন্য তা ৫ লাখ টাকা করার দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাব করেন। পাশাপাশি, সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে এবং সততাকে পুরস্কৃত করতে বাজেটে থাকা কালো টাকা সাদা করার বিতর্কিত বিধানটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার জন্য তিনি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এছাড়া, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক বিকাশের লক্ষ্যে পার্বত্য তিন জেলায় তাদের পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আয়ের পাশাপাশি পাহাড়ে ও সমতলে বসবাসরত সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত ব্যক্তিদের বেতনভোগী আয়কেও করমুক্ত করার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টার্টআপ ফান্ডে বড় ছাড়
দেশের শিক্ষা, আইটি ও কর্মসংস্থান খাতের আমূল উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করেন:
- বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর হ্রাস: বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর প্রযোজ্য ১০ শতাংশ কর হ্রাস করে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন তিনি। তবে একই সঙ্গে এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদার করা, শিক্ষার্থীদের বহু ভাষায় পারদর্শী করতে ল্যাংগুয়েজ ল্যাব স্থাপন এবং গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
- ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড: ফ্রিল্যান্সার এবং স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য বর্তমান সরকারের বিশাল পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মতো তরুণদের নতুন উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ ফান্ডিংয়ের জন্য বাজেটে ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।”
দেশীয় শিল্প ও মৎস্য খাতের শুল্ক-ভ্যাট হ্রাস
দেশীয় শিল্পের বিকাশ, রপ্তানি বৃদ্ধি ও বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রধানমন্ত্রী আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর শুল্ক হ্রাসের একগুচ্ছ সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন:
| খাতের নাম / আমদানিকৃত পণ্য | প্রস্তাবিত বর্তমান শুল্ক/ভ্যাট | প্রধানমন্ত্রীর সংশোধনী প্রস্তাব |
| চিংড়ি চাষের একিউফিড, ফিড এডিটিভস, প্রোবায়োটিক্স, ভিটামিন ও মিনারেলস | বিদ্যমান শুল্ক ও ভ্যাট | সমুদয় শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার |
| পিভিসি ও পেট রেজিন ($PVC\ \&\ PET\ Resin$) | ১০% আমদানি শুল্ক | কমিয়ে ৫% নির্ধারণ |
| অপ্রক্রিয়াজাত ক্যাশনাট (কাজুবাদাম) কাঁচামাল | ১৫% কাস্টমস শুল্ক | কমিয়ে ৫% নির্ধারণ |
| ওষুধ ও স্থানীয় শিল্পে ব্যবহৃত মধু | ১০% সম্পূরক শুল্ক | সম্পূর্ণ প্রত্যাহার |
| ফায়ার ডোর উৎপাদনের কোল্ড রোল্ড শিট | ১০% রেগুলেটরি শুল্ক | সম্পূর্ণ প্রত্যাহার |
| ফ্ল্যাট রোল্ড প্রোডাক্ট | ১০% আগাম কর | সম্পূর্ণ প্রত্যাহার |
| বৈদ্যুতিক তার উৎপাদনের রিফাইন কপার | ১০% রেগুলেটরি শুল্ক | সম্পূর্ণ প্রত্যাহার |
এছাড়া, স্থানীয়ভাবে এলইডি ল্যাম্প ($LED\ Lamp$) এবং প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড বিল্ডিং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানির রেয়াতি সুবিধা ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বর্ধিত করার অনুরোধ জানান তিনি।
ব্যবসায়ীবান্ধব ভ্যাট ব্যবস্থা ও গণপরিবহনে প্রণোদনা
ব্যবসায়ীবান্ধব ভ্যাট ব্যবস্থা প্রণয়নের লক্ষ্যে স্বর্ণ, ডায়মন্ড ও রৌপ্য অলংকারের ভ্যাটের হার পুনর্নির্ধারণের তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সাথে বিটিআরসি ($BTRC$)-র রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং মাছ সরবরাহের জোগানদার পর্যায়ের ১০ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি। দেশের রাজনীতি, ব্যবসা ও নির্বাচনী প্রচারণায় বহুল ব্যবহৃত ডাবল কেবিন পিকআপ এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম মাইক্রোবাস স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে মাত্র ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।



















