দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে লোডশেডিং পরিস্থিতিতে। এপ্রিলের শুরু থেকেই লোডশেডিং নতুন মাত্রা পেয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, মে-জুন মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বর্তমানে চাহিদার তুলনায় উৎপাদনের বড় ধরনের ঘাটতি থাকায় শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের দৈনিক গড় চাহিদা প্রায় ১৫,৫০০ থেকে ১৬,০০০ মেগাওয়াট। তবে প্রকৃত উৎপাদন হচ্ছে ১৩,০০০ থেকে ১৪,০০০ মেগাওয়াটের মধ্যে।
- সর্বশেষ পরিসংখ্যান: গত সোমবার সন্ধ্যায় ১৫,৩৩০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি ছিল ১,৩৫৮ মেগাওয়াট। দিনের বিভিন্ন সময়ে লোডশেডিং ২,০০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।
- সক্ষমতা বনাম বাস্তবতা: আমদানিসহ দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮,৪৯৪ মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে চাহিদানুযায়ী উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।
অঞ্চলভেদে লোডশেডিংয়ের বৈষম্য
বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য লক্ষ্য করা গেছে। মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৩৮% ঢাকায় সরবরাহ করা হয়, ফলে ঢাকার বাইরে অন্যান্য বিভাগে হাহাকার অবস্থা বিরাজ করছে।
| অঞ্চল | লোডশেডিংয়ের সময়কাল (দৈনিক) | পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত রূপ |
| বরিশাল | ১০ – ১২ ঘণ্টা | দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি; দিনে ৮-১০ বার বিদ্যুৎ যায়। |
| রাজশাহী | ৮ – ১২ ঘণ্টা | কৃষি সেচ ও রাতের পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ থাকে না। |
| খুলনা | ৬ – ১০ ঘণ্টা | শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। |
| চট্টগ্রাম | ৬ – ৮ ঘণ্টা | শহর এলাকায় ভালো থাকলেও গ্রামে ১৬-১৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। |
| ঢাকা বিভাগ | ৬ – ৮ ঘণ্টা (গ্রাম) | শহরের বাইরে উপজেলা পর্যায়ে দিনে ৫-৭ বার বিদ্যুৎ যায়। |
| ঢাকা শহর | ১ – ২ ঘণ্টা | অনেক এলাকায় লোডশেডিং প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। |
অর্থনীতি ও কৃষিতে প্রভাব
তীব্র লোডশেডিংয়ের ফলে দেশের উৎপাদনশীল খাতগুলো গভীর সংকটে পড়েছে:
- শিল্প খাত: গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় গার্মেন্টস ও কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাঁত শিল্পের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।
- কৃষি খাত: বোরো মৌসুমে সেচ পাম্প পর্যাপ্ত সময় চালাতে না পারায় কৃষকরা ফসল নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। নওগাঁ, নাটোর ও কুমিল্লার কৃষি অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
- আবাসিক জীবন: তাপপ্রবাহের কারণে এসি, ফ্যান ও কুলিং ডিভাইসের ব্যবহার বাড়লেও বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী তাপমাত্রা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার চলতি গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ ১৮,৫০০ মেগাওয়াট চাহিদার প্রক্ষেপণ করলেও জ্বালানি সংকট নিরসন না হলে এই বিপুল চাহিদা মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।



















