ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক সংঘাত বা যুদ্ধের তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ. দিল্লির পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক ‘সিন্ধু নদ জলচুক্তি’ স্থগিত করার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি এই কড়া অবস্থান ব্যক্ত করেন. শনিবার (২০ জুন) পাকিস্তানের টেলিভিশন চ্যানেল এআরওয়াই নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সরাসরি ঘোষণা করে বলেন, ‘যে মুহূর্তে আমরা অনুভব করব যে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা, এবং পানি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তারই অংশ, হুমকিতে পড়েছে, আমরা ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাব. অবশ্যই.’ তিনি দাবি করেন, ভারত যদি উদ্বেগজনক গতিতে পাকিস্তানের পানি সরবরাহ ব্যাহত করার কোনো পদক্ষেপ নেয় এবং ইসলামাবাদ যদি এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পায়, তবে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনা করা হবে.
জলচুক্তি স্থগিতের পটভূমি ও ভারতের অবস্থান
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এমন উসকানিমূলক মন্তব্য মূলত গত এপ্রিল মাসে পাহলগামে ঘটে যাওয়া একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার জের ধরে এসেছে. ওই হামলায় ২৬ জন মানুষ নিহত হওয়ার পর ভারত সরকার ১৯৬০ সালের ঐতিহাসিক সিন্ধু নদ জলচুক্তিটি দৃঢ়ভাবে স্থগিত ঘোষণা করে. ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, পাকিস্তান যতক্ষণ না তাদের সীমান্ত পারের সমস্ত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক এবং অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে নির্ভরযোগ্য ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে. বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় হওয়া এই ঐতিহাসিক চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী পাকিস্তান সাধারণত সিন্ধু অববাহিকার প্রায় ৮০ শতাংশ পানি তাদের কৃষিকাজের জন্য ব্যবহার করার আইনি অধিকার পেয়ে থাকে.
পানির অপব্যবহার ও খাজা আসিফের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
বর্তমানে দেশের ভেতরে তীব্র অব্যবস্থাপনার কারণে পাকিস্তানের বিশাল ফসলি জমি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে. তবে পাকিস্তানি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এই অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার দায় সম্পূর্ণ নয়াদিল্লির ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন. তাঁর অভিযোগ, ভারত মূলত পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে এবং চেনাব নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন রাখছে. অবশ্য খাজা আসিফ নিজেই স্বীকার করেছেন যে, অতীতে পাকিস্তানি প্রতিনিধি দল ভারতের বিভিন্ন জলপ্রকল্পে প্রায় ১১৫ বার পরিদর্শন কাজ সম্পন্ন করলেও বিগত এক বছরে সীমান্তের ওপাড়ে ঠিক কী ধরনের উন্নয়ন বা পরিবর্তন হয়েছে, সে বিষয়ে বর্তমানের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য তাঁর কাছে নেই. তাঁর এই স্বীকারোক্তি নিজের তোলা অভিযোগের সত্যতাকে অনেকটাই দুর্বল করে দেয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা.
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ পানি সংকট ও অবকাঠামোগত ব্যর্থতা
অন্যদিকে, ভারতের সাথে এই বিরোধের বাইরে পাকিস্তানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে. এর ফলে দেশটির সিন্ধু ও বেলুচিস্তান প্রদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সাধারণ মানুষ এখন তীব্র পানির অভাবে ভুগছেন. সিন্ধু প্রদেশের সেচ বিভাগের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, দেশটির সেচ অবকাঠামোগুলো এখন চরম ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে.
বর্তমানে পাকিস্তানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খালে পানির ঘাটতির চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
- দাদু খাল: সর্বোচ্চ ৮২ শতাংশ পর্যন্ত পানির ঘাটতি রেকর্ড করা হয়েছে.
- উত্তর পশ্চিম খাল: ৬৪.১ শতাংশ পানির ঘাটতি রয়েছে.
- রাইস খাল: ৩৮ শতাংশ পানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে.
দক্ষিণ পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুক্কুর ব্যারাজে পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় স্থানীয় নেতারা বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন. বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রদেশের অভ্যন্তরীণ পানি বণ্টন নিয়ে তৈরি হওয়া তীব্র রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক বিরোধের সমাধান করতে সরকারের স্পষ্ট ব্যর্থতাই মূলত এই সংকটের মূল কারণ.


















