ভারতের খ্যাতনামা গণমাধ্যম ‘এই সময়’-কে দেওয়া একটি সুদীর্ঘ ও অত্যন্ত খোলামেলা একান্ত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বর্তমান বিএনপি সরকার, দেশের ভূ-রাজনীতি এবং নিজের অবস্থান নিয়ে সবিস্তার কথা বলেছেন. গণভবন ছেড়ে আসা থেকে শুরু করে ইস্তফা না-দেওয়ার কারণ, বর্তমান তারেক রহমান সরকারের মূল্যায়ন এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ— সব বিষয়েই নিজের গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন তিনি.
পাকিস্তানপন্থী ভাবধারা ও ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’র তীব্র সমালোচনা
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই ঢাকাস্থ পাকিস্তান দূতাবাসের তৎপরতা এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে ইসলামাবাদের সঙ্গে সখ্য বৃদ্ধি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে. সরকার একে ‘নতুন কূটনীতি’ বা ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’ হিসেবে দাবি করলেও শেখ হাসিনা একে দেখছেন ভিন্নভাবে:
- ইতিহাসের অবমাননা: শেখ হাসিনা বলেন, “রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখা আর পাকিস্তানি ভাবধারায় রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে নেওয়া, দুটো এক বিষয় নয়।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে যেকোনো সম্পর্ক হতে হবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা রক্ষা করে এবং বাংলাদেশের আত্মসম্মান ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রেখে.
- বিপজ্জনক খেলা: যারা এই ঘনিষ্ঠতাকে নতুন কূটনীতি বলছেন, তাদের উদ্দেশে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে শেখ হাসিনা বলেন, পাকিস্তান কি ১৯৭১-এর গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছে বা যুদ্ধাপরাধের দায় স্বীকার করেছে? তা যদি না করে থাকে, তবে এত তাড়াহুড়ো করে সামরিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা কেন? তাঁর মতে, যারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ছায়ায় ফেরাতে চান, তারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিপজ্জনক খেলা খেলছেন.
বিএনপি-জামায়াত সম্পর্ক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় আঘাতের অভিযোগ
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বহু মানুষ জামায়াতে ইসলামীকে ঠেকাতে বাধ্য হয়ে বিএনপিকে ভোট দেওয়ার যে দাবি করেছিলেন, সেই প্রসঙ্গে বিএনপি সরকারের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী:
- একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ: শেখ হাসিনা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “যারা ভেবেছিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে জামায়াতের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো হবে, তারা ইতিহাস ভুলে গিয়েছিলেন। বিএনপি ও জামায়াত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।” বিএনপির হাত ধরেই দেশে জামায়াতের পুনর্বাসন হয়েছে এবং তারা উভয়েই মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী রাজনৈতিক চেতনার অংশীদার.
- সংখ্যালঘু ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত: তিনি প্রশ্ন তোলেন, মানুষ যদি জামায়াতকে ঠেকাতে বিএনপিকে ভোট দিয়ে থাকে, তবে দেশে কেন এখন মাজারে হামলা হচ্ছে? সুফিদের দরগা কেন নিরাপদ নয়? তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আহমদিয়া ও আদিবাসী— কেউই নিরাপদ বোধ করছেন না. একই সঙ্গে দেশের পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃতি, প্রশাসন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব জায়গায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর সুপরিকল্পিত আঘাত আসছে.
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ও ঢাকা-নয়াদিল্লি ‘নতুন ইনিংস’ প্রসঙ্গ
বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি ‘নতুন ইনিংস’ বা সুসম্পর্ক স্থাপনের প্রয়াস নিয়ে নিজের অনড় অবস্থানের কথা জানান শেখ হাসিনা:
- নিজের অবস্থান ও প্রত্যর্পণ বিতর্ক: সম্পর্কের স্বার্থে ভারত যদি শেখ হাসিনাকে বিচারের জন্য ঢাকায় ফেরত পাঠাতে চায়, তবে তাঁর পদক্ষেপ কী হবে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারত তাদের diplomatic কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং বাংলাদেশে যে সরকারই থাকুক, তাদের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ থাকাটাই স্বাভাবিক. তবে এর ফলে তাঁর অবস্থান দুর্বল হবে না, কারণ তাঁর অবস্থান নির্ভর করে বাংলাদেশের মানুষের ওপর. কঠিন সময়ে পাশে থাকার জন্য ভারত সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “সরকারে থাকতে আমি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করেছি বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে। কিন্তু বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কখনও বিসর্জন দিইনি।”
- নতুন ইনিংস দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ার আশঙ্কা: তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে ভারতের এই নতুন সুসম্পর্কের চেষ্টা ফলপ্রসূ হবে না বলে মনে করেন শেখ হাসিনা. তিনি মন্তব্য করেন, দুদেশের টেকসই সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি হলো বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা. যারা প্রতিনিয়ত হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভারত-বিরোধী অপপ্রচারকে প্রশ্রয় দিচ্ছে এবং অতীতে ভারতের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তাদের সঙ্গে ভারতের কোনো নতুন ইনিংসই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না.



















