আজ রোববার (৩১ মে) বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০২৬’. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তামাক কোম্পানির নানামুখী কৌশল রুখতে এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি: তামাক ও নিকোটিন আসক্তি প্রতিরোধ করি’. বর্তমানে প্রতি চার সেকেন্ডে বিশ্বজুড়ে তামাক ও তামাকজনিত মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে অন্তত একজন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এবং দিন দিন তামাকের সামগ্রিক ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর তামাক ব্যবহারের কারণে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে. বাংলাদেশেও তামাকের কারণে বছরে প্রায় ২ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন এবং ১০-১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ২.৪৮ শতাংশে পৌঁছেছে. ২০২৪ সালের এক হিসাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা তামাকখাত থেকে সরকারের প্রাপ্ত মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় দ্বিগুণ.
বিশ্বব্যাপী প্রথাগত তামাক নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ায় সাধারণ সিগারেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০০০ সালের ১.৩৮ বিলিয়ন থেকে ২০২৪ সালে ১.২০ বিলিয়নে নেমে এসেছে. এই পরিস্থিতিতে তামাক কোম্পানিগুলো এখন তাদের লক্ষ্য পরিবর্তন করে শিশু, কিশোর ও নতুন প্রজন্মকে টার্গেট করেছে. তারা ই-সিগারেট, ভেপিং, হিটেড টোব্যাকো ও নিকোটিন পাউচের মতো নতুন প্রজন্মের নিকোটিন পণ্যগুলোকে ‘কম ক্ষতিকর’ বা ‘ধূমপান ছাড়ার সহায়ক’ এমন মিথ্যা তথ্যের ফাঁদ পেতে বাজারজাত করছে. বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে বাবলগাম, চকোলেট ও মিন্টসহ ১৬ হাজারের বেশি আকর্ষণীয় সুগন্ধিযুক্ত নিকোটিন পণ্য রয়েছে, যার অনেকগুলো আবার ইউএসবি ড্রাইভ, কলম বা খেলনার আদলে তৈরি করা হচ্ছে. বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি কিশোর-কিশোরী নিয়মিত ই-সিগারেট ব্যবহার করছে, যাদের প্রধান অংশ ১৩-১৫ বছর বয়সী এবং তারা আগে কখনো ধূমপায়ী ছিল না. টিকটক, ইউটিউব, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইনফ্লুয়েন্সার ও সেলিব্রেটি মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে এই প্রচারণা ব্যাপকভাবে চালানো হচ্ছে. গবেষণায় দেখা গেছে, ই-সিগারেট ব্যবহারকারী শিশু-কিশোরদের পরবর্তীতে প্রথাগত বা সাধারণ সিগারেট ব্যবহারের ঝুঁকি প্রায় তিনগুণ বেশি থাকে.
যদিও ই-সিগারেট বা ভেপিংকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি এবং সিডিসির গবেষণায় এর গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রমাণিত হয়েছে. ই-সিগারেট ব্যবহারের ফলে ফুসফুসের জটিলতা, হৃদরোগ, রক্তনালির ক্ষতি, ক্যান্সারের ঝুঁকি, মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হওয়া, শেখার সক্ষমতা হ্রাস এবং তীব্র উদ্বেগজনিত সমস্যা দেখা দেয়. বাংলাদেশে সম্প্রতি ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে. এই আইনে নির্ধারিত ধূমপান এলাকা বাতিল, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ করার মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও উদ্বেগজনকভাবে ই-সিগারেট ও ভেপিং নিষিদ্ধের বিধানটি বাদ দেওয়া হয়েছে. ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী এবং ‘প্রজ্ঞা’র নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করতে ই-সিগারেট ও ভেপিংয়ের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সকল তামাকপণ্যের দাম কার্যকরভাবে বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যাওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন.



















