বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে বড় ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকা। আজ মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল, ২০২৬) দুই দিনের সফরে ভারতের রাজধানী দিল্লির উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর এটিই কোনো বাংলাদেশি মন্ত্রীর প্রথম উচ্চপর্যায়ের ভারত সফর, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
১. সফরের প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব
সফরটি মূলত মরিশাসে অনুষ্ঠেয় ‘ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্স’-এ যোগ দেওয়ার পথে একটি যাত্রাবিরতি হলেও, এর মূল লক্ষ্য দুই দেশের বিদ্যমান ‘টানাপোড়েন’ নিরসন করা। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে থাকছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
- নতুন অধ্যায়: ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতির পর পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থের ভিত্তিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে চায় ঢাকা।
- ইতিবাচক সংকেত: বেগম জিয়ার প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শ্রদ্ধা এবং নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে দিল্লির প্রতিনিধি পাঠানোকে ইতিবাচক সূচনা হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ।
২. আলোচনার মূল ইস্যুসমূহ
এই সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বেশ কিছু জনগুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয় আলোচনার টেবিলে রাখা হবে:
- সীমান্ত হত্যা: সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে বাংলাদেশি নিহতের ঘটনা বন্ধে জোরালো দাবি জানানো হবে।
- পলাতক নেতাদের প্রত্যাবর্তন: ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতাদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলবে ঢাকা।
- পানি ও জ্বালানি: গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে ডিজেল আমদানির বিষয়টি চূড়ান্ত করার চেষ্টা থাকবে।
- ভিসা জটিলতা: বর্তমানে সাধারণ নাগরিকদের ভারত ভ্রমণে যে ভিসা জটিলতা রয়েছে, তা নিরসনের দাবি জানানো হবে।
৩. সফরের সূচি ও বৈঠক
৭ এপ্রিল বিকেলে ঢাকা ত্যাগের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যস্ত সময়সূচি নির্ধারিত হয়েছে:
- ৭ এপ্রিল সন্ধ্যা: ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক।
- ৮ এপ্রিল: ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক।
- অন্যান্য: ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিষয়ক মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরি এবং বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
৪. সরকারের প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, যোগাযোগের অভাব সম্পর্কের ক্ষতি করে। তাই সব প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশ সামনে এগিয়ে যাবে—এটাই বর্তমান সরকারের প্রত্যাশা। ভারতের সাথে কোনো একতরফা নয়, বরং পজিটিভ ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে সীমান্ত হত্যাসহ সব অমীমাংসিত ইস্যু সমাধানের পথ খুঁজছে ঢাকা।
এই সফরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্কের বরফ গলবে এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত যোগাযোগ আরও সুসংহত হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।



















