সিলেটের সবুজ ঘাসের পিচে ২০২১ সালে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে উইন্ডিজ ব্যাটার কাইল মায়ার্সের সেই মহাকাব্যিক অপরাজিত ২১০ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংসের ভূত যেন নতুন করে চেপে বসেছিল। সেবার প্রায় ৩৯৫ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করে বাংলাদেশের মুখ থেকে অবিশ্বাস্য এক জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আজ বুধবার (২০ মে) সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টেস্টের শেষ দিনে ৪৩৭ রানের এক অসম্ভব ও পর্বতসম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তাতে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে হুট করেই মায়ার্সের সেই চট্টগ্রাম টেস্টের দুঃসহ স্মৃতি কড়া নাড়ছিল। বিশেষ করে পাকিস্তানি ব্যাটার মোহাম্মদ রিজওয়ান যেভাবে উইকেটে অবিচল থেকে বাংলাদেশি বোলারদের শাসন করছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল রিজওয়ানই বুঝি হতে যাচ্ছেন পাকিস্তানের ‘কাইল মায়ার্স’। তবে শেষ পর্যন্ত সব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে স্পিন জাদুতে পাকিস্তানকে ৭৮ রানের ব্যবধানে হারিয়ে ঐতিহাসিক জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। এই অবিস্মরণীয় জয়ের ফলে টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার পর মাত্র দ্বিতীয় দল হিসেবে পাকিস্তানকে টানা দুই টেস্ট সিরিজে ‘হোয়াইটওয়াশ’ করার বিরল ও গৌরবময় কীর্তি গড়লো টাইগাররা। একই সাথে দেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে এটিই বাংলাদেশের প্রথম কোনো টেস্ট সিরিজ জয়ের নজির।
রিজওয়ানের প্রতিরোধ ভাঙলেন তাইজুল, পাকিস্তানের নাটকীয় ধস: ম্যাচের পঞ্চম ও শেষ দিনে ৪৩৭ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তান একপর্যায়ে ম্যাচটি জমিয়ে তোলে এবং খেলাটি বাংলাদেশের হাত ফসকে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছিল। ক্রিজে থিতু হওয়া মোহাম্মদ রিজওয়ানের ব্যাটে ভর করেই পাকিস্তান টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে নতুন এক জয়ের মহাকাব্য লেখার স্বপ্ন দেখছিল। তবে দিনের মধ্যভাগে ম্যাচের পুরো দৃশ্যপট একাই বদলে দেন বাংলাদেশের অভিজ্ঞ বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। উইকেটে জমে যাওয়া এবং জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো সাজিদ খানকে সাজঘরে ফিরিয়ে প্রথম মরণকামড়টি দেন তাইজুল। আর সাজিদের এই বিদায়ই যেন পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনে এক প্রলয়ংকরী ধস ডেকে আনে। সাজিদ খান আউট হওয়ার পর পাকিস্তানের ব্যাটাররা স্কোরবোর্ডে আর একটি রানও যোগ করতে পারেননি; কোনো রান না তুলেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে সফরকারীদের পুরো লেজকাটা ব্যাটিং লাইনআপ। ফলে শেষ বিকেলের রোমাঞ্চে ৭৮ রানের দারুণ জয় দিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ।
পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশের ঐতিহাসিক গ্রাফ:
┌─────────────────────────┐ ┌─────────────────────────┐ ┌─────────────────────────┐
│ ১ম সিরিজ: রাওয়ালপিন্ডি │ ───> │ ২য় সিরিজ: মিরপুর ও সিলেট │ ───> │ অস্ট্রেলিয়ার পর ২য় দল │
│ (পাকিস্তানের মাটিতে জয়) │ │ (দেশের মাটিতে ১ম জয়) │ │ হিসেবে অনন্য বিশ্বরেকর্ড │
└─────────────────────────┘ └─────────────────────────┘ └─────────────────────────┘
টাইগারদের বিশ্বরেকর্ড ও ঘরের মাঠে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়: রাওয়ালপিন্ডিতে প্রথম টেস্ট সিরিজে পাকিস্তানকে তাদের ঘরের মাঠে ধবলধোলাই করার পর, এবার মিরপুর ও সিলেটের মাটিতেও বাবর-রিজওয়ানদের ওপর পূর্ণ আধিপত্য বজায় রাখলো শান্ত-তাইজুলরা। ক্রিকেটের দীর্ঘ সংস্করণে পাকিস্তানকে টানা দুটি সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করার এই রেকর্ডটি এর আগে কেবল বিশ্বক্রিকেটের পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়ার ছিল, এবার সেই অভিজাত ক্লাবে রাজকীয় প্রবেশ ঘটলো বাংলাদেশের। ক্রিকেট বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, তাইজুলের এই সময়োপযোগী ও নিয়ন্ত্রিত বোলিং স্পেল এবং ফিল্ডারদের দারুণ বোঝাপড়া এই ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয়ে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে, যা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম সেরা একটি অর্জন হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।



















