বৃহস্পতিবার (১২ জুন, ২০২৫) দুপুর ১টা ৩৮ মিনিটে ভারতের আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের (গ্যাটউইক) উদ্দেশে উড্ডয়নের কয়েক মিনিটের মধ্যেই এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার মডেলের উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে। বিমানটি আহমেদাবাদের মেঘানি অঞ্চলের একটি আবাসিক এলাকায় অবস্থিত বি জে মেডিকেল কলেজের হোস্টেল ভবনের ওপর ভেঙে পড়ে।
হতাহতের বিস্তারিত:
- ২৪২ আরোহীর সবাই নিহত: এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় উড়োজাহাজটিতে থাকা মোট ২৪২ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্যের (যার মধ্যে ২১৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক, ১১ জন শিশু এবং ২ জন নবজাতক) কেউই জীবিত নেই বলে নিশ্চিত করেছেন শহরের পুলিশ কমিশনার ‘অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’কে (এপি)। ঘটনাস্থল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই দগ্ধ অবস্থায়।
- বিমানে থাকা যাত্রীদের জাতীয়তা: যাত্রীদের মধ্যে ১৬৯ জন ভারতীয়, ৫৩ জন ব্রিটিশ, সাতজন পর্তুগিজ এবং একজন কানাডীয় নাগরিক ছিলেন।
- মেডিকেল শিক্ষার্থীদের প্রাণহানি: দুর্ঘটনার সময় হোস্টেলের ডাইনিং হলে অনেক শিক্ষার্থী খাবার খাচ্ছিলেন। স্থানীয় পুলিশের ভাষ্যমতে, এই ঘটনায় অন্তত ৫ জন মেডিকেল শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন এবং অনেকে আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর তোলা ছবিতে হোস্টেলের ক্যান্টিনে টেবিলের ওপর খাবারের থালা ও গ্লাস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে, যা ঘটনার আকস্মিকতা ও ভয়াবহতা তুলে ধরে।
- অন্যান্য হতাহত: বিমানটি একটি আবাসিক এলাকায় বিধ্বস্ত হওয়ায়, বিমানে আরোহী ছাড়াও ঘটনাস্থলের আশেপাশের কিছু স্থানীয় বাসিন্দা হতাহত হয়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উড়োজাহাজ ও দুর্ঘটনার প্রকৃতি:
- মডেল ও ইতিহাস: বিধ্বস্ত হওয়া বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার মডেলের এই উড়োজাহাজটি ২০১৩ সালে প্রথম উড়েছিল এবং ২০১৪ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার বহরে যুক্ত হয়। এটি ড্রিমলাইনার মডেলের প্রথম বড় এবং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
- বিধ্বস্তের ধরন: উড়োজাহাজটি উড্ডয়নের মাত্র পাঁচ মিনিট পরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং একটি “মেডে” (Mayday) জরুরি সংকেত পাঠায়, কিন্তু এরপর এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সাথে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। বিমানটি হোস্টেলের মেস বিল্ডিংয়ে আঘাত করে এবং এরপর অতুলিয়াম হোস্টেলে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়। বিধ্বস্তের ফলে উড়োজাহাজের পেছনের অংশ ভবনের ছাদে আটকে পড়ে এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন অংশ হোস্টেলের ভেতর ও বাইরে ছড়িয়ে পড়ে, যা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি করে।
উদ্ধার অভিযান ও প্রতিক্রিয়া:
- উদ্ধার অভিযান: ভারতীয় সেনাবাহিনী, এনডিআরএফ, সিআরপিএফ এবং কোস্ট গার্ডের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। একটি সামরিক হাসপাতালকেও স্ট্যান্ডবাইতে রাখা হয়েছে।
- রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই দুর্ঘটনাকে “শব্দহীন হৃদয়বিদারক” বলে বর্ণনা করেছেন এবং ত্রাণ কার্যক্রম তদারকির জন্য মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই দৃশ্যকে “বিধ্বংসী” বলে উল্লেখ করেছেন। ভারত সরকার এবং এয়ার ইন্ডিয়া নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে এবং তথ্য ও সহায়তার জন্য হেল্পলাইন চালু করেছে।
বোয়িংয়ের শেয়ারে ধস: এয়ার ইন্ডিয়ার ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় মার্কিন উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের শেয়ারের দাম একদিনে ৮ শতাংশ কমে গেছে। এটি বোয়িংয়ের অত্যাধুনিক ড্রিমলাইনার বিমানের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। বোয়িং আগে থেকেই ৭৩৭ ম্যাক্স সিরিজের দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও দীর্ঘ সময় ধরে চলা গ্রাউন্ডেড পরিস্থিতির জন্য আলোচনায় ছিল। এই দুর্ঘটনা কোম্পানির জন্য আরও একটি বড় ধাক্কা।



















