সোমবার , ২ জুন ২০২৫ | ১৯শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  1. অপরাধ
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. এভিয়েশন
  6. কৃষি
  7. ক্যাম্পাস
  8. খেলাধুলা
  9. ছবি
  10. জনদুর্ভোগ
  11. জনপ্রিয়
  12. জাতীয়
  13. ডেঙ্গু
  14. দুর্ঘটনা
  15. ধর্ম

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নিরপেক্ষতা ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

প্রতিবেদক
অনলাইন ডেস্ক
জুন ২, ২০২৫ ১:৪৬ পূর্বাহ্ণ

Spread the love

৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় প্যারিসে অবস্থান করা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ৮ আগস্ট দেশে ফিরে বলেছিলেন, “বাংলাদেশের সামনে একটি অসাধারণ সুযোগ। এ সুযোগ আর পাব না, এ সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না।” তবে, তার ১০ মাসের শাসনে অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, তার নেতৃত্বেই কি বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হারাচ্ছে? এই সুযোগ কি সত্যিই জনগণের জন্য, নাকি মুষ্টিমেয় কিছু বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য? অভিযোগ উঠেছে, প্রধান উপদেষ্টা নিজেই ক্রমে নিরপেক্ষতা হারাচ্ছেন এবং বিশেষ দল, গোষ্ঠী বা বিদেশি শক্তির প্রতি আনুগত্য দেখাতে গিয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা করে নিজেকে বিতর্কিত করছেন।


নোবেলজয়ীর বিতর্কিত ভূমিকা

ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিঃসন্দেহে একজন বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব এবং শান্তিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত জীবন্ত কিংবদন্তি। জাতি তার কাছে প্রত্যাশা করেছিল সংকটের সময়ে তিনি দেশের অভিভাবক হিসেবে পথ দেখাবেন এবং একটি সম্ভাবনাময় নতুন বাংলাদেশের কান্ডারি হবেন। কিন্তু এই সরকারের ১০ মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন। তাকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি হচ্ছে, এবং অনেকে মনে করেন যে এই বিতর্কগুলো তিনিই সৃষ্টি করছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তিনি নিজের স্বার্থ যতটুকু দেখেছেন, ততটা জনগণের স্বার্থে নজর দেননি।


মামলার প্রত্যাহার ও রাজনৈতিক হয়রানি

এই সময়ের মধ্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের দায়ের করা বিচারাধীন সব মামলা হয় প্রত্যাহার করা হয়েছে, না হয় আদালত বাতিল করেছেন। এটি বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কারণে দ্রুত গতিতেই এসব সম্ভব হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার মামলাগুলোর ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের দায়েরকৃত মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের কাজে গতি নেই। বিশেষ করে বিএনপির বহু নেতা ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা, এমনকি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো ‘কালো আইনে’ দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারে দীর্ঘ কালক্ষেপণ করা হচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মামলা মুক্ত হতে ১০ মাস লেগেছে, অথচ প্রধান উপদেষ্টা মাত্র এক মাসের মধ্যে তার সব মামলা প্রত্যাহার করিয়েছেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে ৬৬৬ কোটি টাকার কর আরোপ করা হয়েছিল, যা সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের পরই মওকুফ করিয়ে নেওয়া হয়। এই সময়ে গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের যে শেয়ার ছিল, তা তিনি কমিয়ে দিয়েছেন। অনেকের প্রশ্ন, অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে কেন তাকে এই কাজ করতে হবে? গ্রামীণ ব্যাংক প্রধান উপদেষ্টার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান—এটি সবাই জানে। তাই এ ধরনের অধ্যাদেশ কি স্বার্থের সংঘাত নয়? অনেকে মনে করেন, একটি নির্বাচিত সরকারপ্রধান এটি করলে তা অনেক বেশি শোভন হতো। এই সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রিক্রুটিং এজেন্সির অনুমতি ও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেয়েছে। এভাবে একের পর এক সুবিধা নেওয়া কতটা শোভন ও মার্জিত—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


ঘন ঘন বিদেশ সফর ও ভিসাসংক্রান্ত জটিলতা

এ সময়ের মধ্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১০ বার বিদেশ সফর করেছেন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যারা বিশ্ব কূটনীতিতে নেতৃত্ব দেয়, তাদের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানরাও ১০ মাসে এতবার বিদেশ সফর করেননি। সেক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা নিঃসন্দেহে একটি অনন্য রেকর্ড স্থাপন করেছেন। কিন্তু এসব সফরের ফলে বাংলাদেশ কতটুকু লাভবান হয়েছে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এই সময়ে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা বন্ধ হয়ে গেছে। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বাংলাদেশিদের ভিসা বন্ধ করেছে, এমনকি থাইল্যান্ডের ভিসা যেন এখন ‘সোনার হরিণ’। ড. ইউনূস দিল্লি থেকে ইউরোপের দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের ডেকে পাঠিয়ে বাংলাদেশ থেকেই ভিসা ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম চালানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন, কিন্তু কেউ সাড়া দেননি। বরং ইউরোপের ভিসা এখন প্রায় বন্ধের উপক্রম।


নিরপেক্ষতা হারানো ও এনসিপির প্রতি পক্ষপাত

ড. ইউনূসের সবকিছুই দেশের মানুষ মেনে নিয়েছিল যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিলেন এবং কারও প্রতি রাগ-অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায় অটুট রাখেন। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, রাজনৈতিক দলগুলোও তাকে নিয়ে বিতর্ক করত না। এমনকি তিনি যখন পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, তখনও বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তারা ড. ইউনূসের পদত্যাগ চায় না। ড. ইউনূস একজন সম্মানিত মানুষ, কিন্তু একজন সম্মানিত মানুষ যখন পক্ষপাতপূর্ণ হন, তখন তিনি নিরপেক্ষতা হারাতে বাধ্য। আর সে কারণেই এখন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তার নিরপেক্ষতা নিয়ে শুধু রাজনৈতিক দলগুলো নয়, সাধারণ মানুষও প্রশ্ন করছে। এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় যখন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামে রাজনৈতিক দলটি গঠিত হয়। এ সময় থেকেই নতুন দলটির প্রতি তার বিশেষ পক্ষপাত লক্ষ্য করা যায়।

এনসিপি জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের একাংশ কর্তৃক সদ্যগঠিত রাজনৈতিক দল। তরুণরা রাজনীতিতে আসবে এবং নতুন ভাবনাচিন্তাগুলো জনগণের মধ্যে সঞ্চালিত করবে—এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারকে নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে হবে। জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই এই আন্দোলনে যারা যুক্ত ছিলেন, তাদের সরকারের উপদেষ্টামন্ডলীতে থাকার যৌক্তিকতা থাকে না। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূস বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুজনকে উপদেষ্টা পদে বহাল রেখেছেন। প্রশ্ন উঠেছে—নাহিদ ইসলাম যদি পদত্যাগ করেন, তাহলে কেন মাহফুজ আলম এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন? যতই এ দুজন বলুন না কেন তারা এনসিপির সঙ্গে নেই, এটি সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে না।

এনসিপির প্রতি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আলাদা সমর্থন এবং ভালোবাসা এখন প্রকাশ্য। তিনি তরুণদের স্নেহ করেন এবং তাদের বিকশিত হতে দিতে চান, সেজন্য এনসিপির প্রতি আলাদা স্নেহ-ভালোবাসা দেখাতেই পারেন। কিন্তু তিনি যখন সরকারপ্রধান, তখন নিরপেক্ষতা খুইয়ে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাত দেখাতে পারেন না।


নির্বাচন পেছানোর আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক বিভাজন

দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি করে আসছে। শুধু বিএনপি নয়, সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, পয়লা জানুয়ারির মধ্যে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার আসবে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান একাধিকবার ডিসেম্বরে নির্বাচনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন এবং এরপর সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা ব্যারাকে ফিরে আসবেন বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূস কিছুতেই ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন করতে আগ্রহী নন বলে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি বিভিন্ন সময়ে বলেছিলেন, “ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে। যদি কম সংস্কার হয় তাহলে ডিসেম্বরে, বেশি সংস্কার হলে নির্বাচন হবে জুনে।” কিন্তু জাপান গিয়ে তিনি যেন তার মনের কথাটি প্রকাশ করে দিলেন। বললেন, “ডিসেম্বরে শুধু একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন চায়।” এই কথাটি শুধু পক্ষপাতদুষ্ট নয়, অসত্যও বটে। এর দ্বারা তিনি দেশের রাজনৈতিক বিভাজন উসকে দিয়েছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো একজন জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য সাধারণ মানুষ আশা করেনি। কারণ সবাই জানেন, এনসিপি ছাড়া প্রায় সব রাজনৈতিক দলই ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন চায়। এর মধ্যে জামায়াত এবং হেফাজত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন পেছানো যেতে পারে বলে বলেছে। তাহলে ডিসেম্বরে নির্বাচন চায় না কারা, সে তালিকা কি ড. মুহাম্মদ ইউনূস দিতে পারেন?


ইশরাক হোসেনের শপথ ও সরকারের অনড় অবস্থান

এর আগে আমরা লক্ষ্য করেছি, যখন নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল ইশরাক হোসেনকে মেয়র হিসেবে ঘোষণা করল এবং নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করল, এর পরই তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের কথা। যেমনটা হয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে। কিন্তু ইশরাক হোসেনের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটল না। বরং কালক্ষেপণ নীতি গ্রহণ করা হলো। আইন উপদেষ্টা ইশরাক হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ পর্যন্ত করলেন না। পুরো পরিস্থিতি দেখে মনে হলো সরকার যেন বিএনপিকে জোর করে রাস্তায় নামাতে চাইছে। বাস্তবে তা-ই ঘটল। সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ইশরাক হোসেনের সমর্থকরা রাজপথে আন্দোলন শুরু করলেন এবং এই আন্দোলন একপর্যায়ে তীব্র আকার ধারণ করল। তখনও ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই দাবির প্রতি কর্ণপাত করলেন না, বরং অভিমান করে পদত্যাগের অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন। এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একের পর এক সিরিজ বৈঠক করলেন। কিন্তু এই বৈঠক খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। সিরিজ বৈঠকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস আপাতত নির্বাচন দিতে চান না। নির্বাচন যারা চায় না, তাদের যেন সংঘবদ্ধ করতে চান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি থাকবেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তিনি কেন এসব বিতর্কের পক্ষ হবেন?

ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচন দিতে চান না কেন তার স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। এই সময় সরকার বেশ কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, যা নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত না নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে। রাখাইন করিডর, চট্টগ্রাম বন্দর—এই বিষয়গুলো নিয়ে পুরো দেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং জাতি উদ্বিগ্ন। এসব বিষয়ে বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো আপত্তি করছে। প্রশ্ন উঠেছে—এসব বিষয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার কি কারও কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ? তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্যই কি তিনি অনড় অবস্থানে আছেন? এজন্যই তিনি ডিসেম্বরে নির্বাচন চান না, নাকি একটি অনির্বাচিত সরকার কায়েমের নীলনকশা বাস্তবায়নে কাজ করছেন? যেটিই তিনি করেন না কেন, তার নিরপেক্ষ অবস্থান ক্ষুণ্ন হয়েছে। দুঃখিত, আমরা কেউ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছ থেকে এ রকম আচরণ প্রত্যাশা করিনি। তিনি জনগণের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন। আশা করি, দ্রুত তিনি তার অবস্থান বুঝতে পারবেন এবং নিজেকে শুধরে নেবেন।

সর্বশেষ - অপরাধ

আপনার জন্য নির্বাচিত