মধ্য আমেরিকার দেশ পানামার দক্ষিণ উপকূলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে বাড়িঘর, গির্জা ও বিভিন্ন ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভূমিকম্পের প্রভাবে দেশটির ছয়টি প্রদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। স্থগিত করা হয়েছে প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট চলাচল। ভূমিকম্পের পর এক ডজনের বেশি আফটারশক অনুভূত হওয়ায় আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় ও খোলা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন বাসিন্দারা।
শুক্রবার বিকেলে পানামার দক্ষিণাঞ্চলে এ ভূমিকম্প আঘাত হানে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৭ দশমিক ৮ মাইল গভীরে। এতে হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
বিদ্যুৎ ও বিমান চলাচল ব্যাহত
বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নাতুরগির তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের কারণে পানামার ছয়টি প্রদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র টোকুমেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর রাজধানী পানামা সিটিতে যান চলাচলে তীব্র জট সৃষ্টি হয়। ভবনগুলোর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বিভিন্ন অফিস থেকে কর্মীদের আগেভাগে ছুটি দেওয়া হয়। বন্ধ রাখা হয় শহরটির মেট্রোরেল চলাচলও। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগে ছুটি ঘোষণা করায় ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নেমে আসতে দেখা যায়। দেশজুড়ে ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে।
ইউএসজিএসের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ভূমিকম্পের কারণে পানামার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ থেকে ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।
প্রায় ৪০ সেকেন্ড ধরে কম্পন
পানামার ভূবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক নেস্টর লুক জানান, আজুয়েরো-সোনা ফল্ট সিস্টেমের কারণে এ ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই সক্রিয় চ্যুতি ব্যবস্থায় চাপ জমা হচ্ছিল। একপর্যায়ে সেই চাপ থেকে বিপুল শক্তি নির্গত হওয়ায় ভূমিকম্পটি ঘটে।
তিনি বলেন, ভূমিকম্পের কম্পন পুরো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এটি অনুভূত হয়েছে।
নেস্টর লুক জানান, রাজধানী পানামা সিটিতে তিনি প্রায় ৪০ সেকেন্ড ধরে কম্পন অনুভব করেছেন। তবে দেশের অন্য কিছু এলাকায় কম্পনের স্থায়িত্ব আরও বেশি হয়ে থাকতে পারে।
রাজধানীর একটি পুরোনো মার্কিন সামরিক আমলের ভবনের ষষ্ঠ তলায় থাকা সাবিনা রিওস জানান, কম্পনটি ছিল অস্বাভাবিক শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী। কয়েক বছরের মধ্যে এত দীর্ঘ সময় ধরে কম্পন অনুভব করেননি বলেও জানান তিনি।
গির্জা ও ভবনে ক্ষয়ক্ষতি
ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছে হেরেরা প্রদেশের কম জনবসতিপূর্ণ লা পিতালোজা এলাকার কাছাকাছি।
রাজধানী পানামা সিটি থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের উৎপত্তিস্থল থেকে ছড়িয়ে পড়া কম্পনে রাজধানীর বিভিন্ন ভবন থেকেও মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কম্পন থামা পর্যন্ত অনেককে রাস্তায় ও কাছের পার্কগুলোতে অবস্থান করতে দেখা গেছে।
রয়টার্সের এক প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে জানানো হয়েছে, প্রতিবেশী দেশ কোস্টারিকার রাজধানী সান হোসেতেও ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।
উৎপত্তিস্থল ও রাজধানীর মাঝামাঝি অবস্থিত পেনোনোমে শহরে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে। রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে একটি গির্জা ও আশপাশের কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত এবং কিছু স্থাপনা ধসে পড়তে দেখা গেছে।
পানামার বেসামরিক সুরক্ষা সংস্থার প্রধান ওমর স্মিথ সংবাদমাধ্যম টেলিমেত্রো রিপোর্টাকে জানান, হেরেরা প্রদেশের রাজধানী চিত্রে এবং উপকূলীয় লস সান্তোস প্রদেশেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
হেরেরা প্রদেশের ৭৪ বছর বয়সী বাসিন্দা রিকার্ডো ব্রাউন জানান, তাঁর বাড়িতে ফাটল ধরেছে। বাড়িটি ধসে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় তিনি ও তাঁর সঙ্গে থাকা আরেকজন বয়স্ক ব্যক্তি আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, লাস মিনাস এলাকায় ভূমিকম্পে বেশ কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সুনামির আশঙ্কা নেই
ভূমিকম্পের পর সুনামির আশঙ্কা তৈরি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সুনামি সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জানিয়েছে, সেই আশঙ্কা কেটে গেছে। বর্তমানে সুনামির কোনো ঝুঁকি নেই বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
এদিকে, আগামী সোমবার পানামায় দেশব্যাপী ভূমিকম্প মোকাবিলায় জরুরি সরিয়ে নেওয়ার মহড়া অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে দেশটির প্রস্তুতি ও সক্ষমতা যাচাই করতে এ মহড়ার আয়োজন করা হয়েছে।
পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো জানিয়েছেন, ভূমিকম্প মোকাবিলায় তাঁর সরকারের সব বিভাগকে সক্রিয় করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি আতঙ্ক বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এবং সম্ভাব্য হতাহতের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পরবর্তী তথ্যের অপেক্ষা করা হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স


















