ইরানের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিমান হামলা এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্নের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে টানা চতুর্থ দিনের মতো অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই, ২০২৬) ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৩৩ সেন্ট বা ০.৪% বেড়ে ৮৫.২৮ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৪২ সেন্ট বা ০.৫% বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮০.০২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর আগের দিন বুধবারও উভয় সূচকের দাম প্রায় ০.৩% বৃদ্ধি পেয়েছিল, যার ফলে তেলের বাজার বর্তমানে গত এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
মূলত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে পুনরায় কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপের পাশাপাশি দেশটির উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে আকস্মিক হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। এর জবাবে ইরান আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানি আরও সীমিত করার হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক ‘অস্তিত্বের যুদ্ধে’ লিপ্ত রয়েছে। নিসান সিকিউরিটিজ ইনভেস্টমেন্টের প্রধান কৌশলবিদ হিরোইউকি কিকুকাওয়া জানান, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল কেনার প্রবণতা এক লাফে অনেক বেড়েছে। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকায় বাজারের ধারণা, এখনো পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম; যদিও সংঘাত আরও তীব্র হলে ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫ থেকে ৮৭ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চলতি সপ্তাহে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ার প্রধান কারণ হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে অচলাবস্থা সৃষ্টির আশঙ্কা, কারণ বৈশ্বিক সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০%) এই প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হতো। গত সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সরাসরি সংঘাত শুরু হওয়ার পর গত জুনের যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি কার্যত আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান যদি তাদের ইয়েমেনের হুথি মিত্রদের ব্যবহার করে লোহিত সাগরের ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালির প্রবেশপথেও নতুন করে সামরিক চাপ সৃষ্টি করে, তবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জ্বালানি পরিবহন পথই একসঙ্গে চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এদিকে বিখ্যাত মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাক্স (Goldman Sachs) এক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানি স্বাভাবিক হতে বিলম্ব হলে চলতি ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে কূটনৈতিক তৎপরতায় উত্তেজনা কমে এলে এবং উৎপাদন প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুত বাড়লে বছরের শেষ দিকে তেলের দাম ৬০ ডলারের ঘরে নেমে আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্যদিকে, মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত ১০ জুলাই শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ১৭ লাখ ব্যারেল হ্রাস পেয়েছে, যা বাজারের সরবরাহ ঘাটতিকে আরও উসকে দিচ্ছে।


















