জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ও রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের সব রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির মধ্যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য ধরে রাখার জোর আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। তিনি অত্যন্ত হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জুলাইয়ের ঐতিহাসিক অর্জন ও আকাঙ্ক্ষা যদি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা না যায়, তবে হাজারো ছাত্র-জনতা ও শহীদদের মহৎ আত্মত্যাগের প্রতি কোনোভাবেই সুবিচার করা হবে না। একই সঙ্গে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল কৃত্রিম রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতা বা মতপার্থক্য থাকলেও, জাতীয় স্বার্থ ও দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। গতকাল রবিবার (১২ জুলাই, ২০২৬) রাজধানীর কাকরাইলে অবস্থিত ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তনে ‘জুলাইয়ের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে ওলামায়ে কেরামের অবদান’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের আইনি সংস্কারের একটি খতিয়ান তুলে ধরেন। তিনি জানান, তাদের দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজনে মোট ১৩৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। বর্তমান নির্বাচিত সরকার এর মধ্য থেকে ৯৮টি অধ্যাদেশকে আইন হিসেবে চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করলেও, বাকি ৩৫টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এই ঝুলে থাকা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে নির্বাচন কমিশন (EC), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভগুলোর আমূল সংস্কারের বিষয় জড়িত রয়েছে। আ ফ ম খালিদ হোসেন দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন যে, বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছাড়া দেশে প্রকৃত অর্থে আইনের শাসন ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। তাই জুলাইয়ের চেতনা বুকে ধারণ করেই শহীদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে এবং যেকোনো মূল্যে এই ঐতিহাসিক বিপ্লবকে সফল করতে হবে।
৮ আগস্টের প্রশাসনিক শূন্যতা ও ১৮ মাসের ত্যাগ
আলোচনা সভায় আ ফ ম খালিদ হোসেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী দেশের নাজুক প্রশাসনিক পরিস্থিতির স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ৮ আগস্ট যখন তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন দেশে কার্যত কোনো সরকার, সংসদ বা আইনগত অভিভাবক ছিল না। সারা দেশে পুলিশ বাহিনী কর্মবিরতিতে ছিল, বহু থানায় অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল এবং এক অভাবনীয় প্রশাসনিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই কঠিন সময়ে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব সাহসিকতার সাথে পালন করেছে।
সাবেক উপদেষ্টা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন:
“আমরা দীর্ঘ ১৮ মাস দিন-রাত এক করে দেশের জন্য কাজ করেছি। সরকারি গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়লেও, ক্ষমতার কোনো বৈষয়িক স্বাদ বা বিলাসিতা আমাদের স্পর্শ করতে পারেনি। এমনকি নিজের জটিল অস্ত্রোপচারের পর সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার আগেই বিদেশ থেকে ফিরেই দেশের বিভিন্ন জেলায় ছুটে গিয়েছি। জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের কবর জিয়ারত করেছি, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের খোঁজ নিয়েছি এবং সংকটাপন্নদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি।”
কাদা-ছোড়াছুড়ি ও আলেমদের অবদান নিয়ে বিশিষ্টজনদের বক্তব্য
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ড. খালিদ হোসেন দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক কাদা-ছোড়াছুড়ি ও দোষারোপের সংস্কৃতি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর পেছনে কোনো ‘তৃতীয় শক্তি’ বা ষড়যন্ত্রকারী মহলের হাত থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পানি ঘোলা করতে পারলে অসাধু শিকারিদের মাছ ধরা সহজ হয়। তাই আমাদের চরম সতর্ক থাকতে হবে। আমরা যে যার দল করি না কেন—জাতি, মিল্লাত ও মাতৃভূমির প্রয়োজনে রাজপথে বুক চিতিয়ে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াব।”
| বক্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব | আলোচনা সভায় দেওয়া মূল বক্তব্য ও দাবিসমূহ (১২ জুলাই, ২০২৬) |
|---|---|
| মাওলানা আব্দুল হালিম (সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, জামায়াত) | শাপলা চত্বরের ঘটনা থেকে শুরু করে প্রতিটি সংকটে জামায়াত আলেম ও মাদ্রাসার পাশে দাঁড়িয়েছে। বিগত স্বৈরশাসনামলে দাড়ি-টুপি-পাগড়ির কারণে বহু ইমাম-খতিব চাকরি হারিয়েছেন এবং স্বাধীনভাবে খুতবা দিতে পারেননি। জুলাইয়ের চেতনা মূলত আলেমদের ঐক্যের প্রতীক। |
| মাওলানা আহমাদ আলী কাসেমী (নায়েবে আমির, হেফাজতে ইসলাম) | ৩৬ দিনের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন হলেও, এর পেছনে আলেম-ওলামা ও রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘ ১৫ বছরের রাজপথের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম ও জনসচেতনতার এক বিশাল ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। |
| মাওলানা যাইনুল আবেদীন (সভাপতি ও সাবেক অধ্যক্ষ, তামীরুল মিল্লাত) | দেশে সামাজিক ন্যায়বিচার, সুশাসন ও ধর্মীয় দ্বীনি মূল্যবোধ সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সব ধারার ওলামা সমাজকে কাদা-ছোড়াছুড়ি ভুলে একক শক্তিতে রূপান্তর হতে হবে। |
তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিশাল ওলামা সমাবেশে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইসলামি স্কলার ও চিন্তাবিদেরা অংশ নেন। সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন বিশিষ্ট ইসলামি স্কলার মুফতি কাজী ইব্রাহীম, সম্মিলিত ওলামা মাশায়েখের মহাসচিব মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মাদানী, মুসলিম জনতা ঐক্য পরিষদের আমির মাওলানা আজিজুর রহমান আজিজ, ছারছিনা দরবার শরিফের মাওলানা শাহ মুহাম্মদ আরিফ বিল্লাহ সিদ্দিকীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় ওলামা ও খতিববৃন্দ। বক্তারা প্রত্যেকেই জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধরে রাখতে আলেম সমাজের বৃহত্তর ঐক্যের ওপর বিশেষ তাগিদ দেন।
#



















