বাংলাদেশের স্বাধীন আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডের সাজা মাথায় নিয়ে প্রায় দুই বছরের নির্বাসন শেষে আগামী ডিসেম্বরের (২০২৬) দিকে দেশে ফেরার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তবে তিনি কোনো চোরাপথে বা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নয়, বরং দেশে ফিরে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে সরাসরি আদালতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করবেন বলে জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে (Reuters) দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ ও বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিক নিজের এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ও ভবিষ্যৎ আইনি পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে আনেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, দেশে পা রাখামাত্রই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে মেরেও ফেলা হতে পারে—এই চরম ঝুঁকি জেনেই তিনি স্বদেশে ফেরার অটল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
‘যদি মৃত্যুও আসে, নিজের মাটিতেই হোক’
সাক্ষাৎকারে নিজের আবেগ ও রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন:
“বাংলাদেশে আমার দলের লাখ লাখ নেতাকর্মী বর্তমানে চরম নিপীড়ন, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এমতাবস্থায় আমি বাইরে থাকতে পারি না। যদি মৃত্যুও আসে, আমি চাই তা আমার নিজের মাটিতেই হোক, যেখানে আমার বাবা-মায়ের কবর রয়েছে এবং যে মাটিতে তাঁদের পবিত্র রক্ত ঝরেছে।”
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মুখে টানা চার মেয়াদের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ছেড়ে সামরিক হেলিকপ্টারে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। এরপর থেকেই তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করতে ভারতের মোদী সরকারের কাছে বারবার কূটনৈতিক চিঠি ও বন্দি বিনিময়ের জোর দাবি জানিয়ে আসছে ঢাকার বর্তমান সরকার। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা রয়টার্সকে জানান, ঢাকার কর্তৃপক্ষ তাঁকে হস্তান্তরের জন্য ভারতকে অনবরত চিঠি দিচ্ছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “তাদের কষ্ট করার দরকার নেই, আমি নিজেই ডিসেম্বরে দেশে ফিরে যাব।” তাঁর এই প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে তিনি ভারত বা অন্য কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা বা দরাদরি করেননি বলেও নিশ্চিত করেছেন।
নেতাকর্মীদের নিয়ে যৌথ আত্মসমর্পণ ও আদালতকে চ্যালেঞ্জ
শেখ হাসিনা জানান, বর্তমানে আওয়ামী লীগের প্রায় সব স্তরের নেতাকর্মীদের নামে ঢালাও মামলা হয়েছে এবং দলের সিংহভাগ নেতা আত্মগোপনে বা প্রবাসে আছেন। তিনি দেশে ফিরে দলের সবাইকে একসঙ্গে করে নিয়ে আইন মেনে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। তিনি দাবি করেন, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে বর্তমান ব্যবস্থা কতটা ‘প্রহসনমূলক’ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা তিনি দেশের মানুষের সামনে আইনিভাবে প্রমাণ করতে চান। তবে ঠিক কবে বা কোন সুনির্দিষ্ট আদালতে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা আত্মসমর্পণ করবেন, সে বিষয়ে নিরাপত্তার স্বার্থে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বা আদালতের নাম উল্লেখ করেননি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে নির্বাসিত আওয়ামী লীগের অন্যান্য শীর্ষ মন্ত্রী ও এমপিরাও শেখ হাসিনার সঙ্গেই দেশে ফিরবেন।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ ও ৩০০ আসনের পুনর্গঠন
বর্তমানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার তীব্র সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন:
- দল নিষিদ্ধের প্রশ্ন: “ব্যক্তি হিসেবে আমাকে সাজা দেওয়া হতে পারে বা আইনি মারপ্যাঁচে আমি হয়তো ভবিষ্যতে নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলকে কেন নিষিদ্ধ করা হবে? দল ভালো বা খারাপ কিছু করে থাকলে, তার চূড়ান্ত বিচার করার একমাত্র অধিকার জনগণের।”
- অনলাইন বৈঠক: তিনি জানান, দিল্লিতে বসে তিনি নিষ্ক্রিয় হয়ে যাননি, বরং দল গোছানোর কাজ করছেন। দল পুনর্গঠন করতে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে তিনি জুম ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিস্তারিত বৈঠক সম্পন্ন করেছেন।
জেলে যাওয়ার বিষয়ে নিজের বিন্দুমাত্র ভয় নেই উল্লেখ করে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, আশির দশকে সামরিক স্বৈরাচারের আমলে দেশে ফেরার পর এবং ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও তিনি দীর্ঘ সময় কারাবরণ করেছিলেন। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিগত দিনে কিছু ভুলত্রুটি হতে পারে স্বীকার করে তিনি বলেন, সরকারের ভালো-মন্দ বিচারের ভার তিনি কেবল দেশের মানুষের ওপরই ছেড়ে দিতে চান।
অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড ও দুই দেশের কূটনৈতিক সমীকরণ
| বিষয়ের বিবরণ | শেখ হাসিনার রয়টার্স সাক্ষাৎকারের মূল নির্যাস ও প্রেক্ষাপট |
| আদালতের রায় (২০২৫) | গত বছরের নভেম্বরে গণঅভ্যুত্থানের প্রাণহানির দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। |
| জাতিসংঘের ডাটা | জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। |
| কূটনৈতিক টানাপোড়েন | শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের কারণে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে দীর্ঘ দুই বছর তীব্র শীতলতা ছিল। |
| রাজনৈতিক অবস্থান | শেখ হাসিনা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা গণহত্যার সমস্ত অভিযোগ বরাবরই রাজনৈতিক অপপ্রচার বলে দাবি করেন। |
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দীর্ঘ দুই বছরের মধ্যে এই প্রথমবার শেখ হাসিনা দেশে ফেরার কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা ছক কষে পরিকল্পনার কথা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে আনলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই বছরের তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পটপরিবর্তন কাটিয়ে ঢাকা যখন আস্তে আস্তে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করছে, তখন বছরের শেষভাগে শেখ হাসিনার এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে এক বিশাল মেরুকরণ ও উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। তবে শেখ হাসিনার এই চাঞ্চল্যকর বক্তব্যের বিষয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার কিংবা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (MEA) পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি।



















