মহাকাশবিজ্ঞানী মিচিও কাকুর সেই বিখ্যাত উক্তি—”১৯৬৯ সালে নাসার পুরো দলের চেয়েও বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা এখন আপনার হাতের মোবাইল ফোনে”—প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য উন্নতির এক অকাট্য দলিল। তবে অ্যাপোলো-১১ মিশনের ৫ দশকেরও বেশি সময় পর কেন ২০২৬ সালেও মানুষকে চাঁদে পাঠাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেই প্রশ্নটি আজ বেশ প্রাসঙ্গিক। আর্টেমিস-২ মিশনের সাম্প্রতিক যাত্রা এই জটিল সমীকরণকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
চাঁদে মানুষের ফেরার এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং আর্টেমিস প্রকল্পের স্বরূপ নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. কম্পিউটিং ক্ষমতা বনাম বাস্তব প্রকৌশল
স্মার্টফোনের প্রসেসিং পাওয়ার অ্যাপোলোর গাইডেন্স কম্পিউটারের চেয়ে লক্ষগুণ বেশি হতে পারে, কিন্তু মহাকাশ যাত্রা কেবল সফটওয়্যারের বিষয় নয়।
- ভৌত চ্যালেঞ্জ: বিকিরণ সুরক্ষা, অক্সিজেন সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং চাঁদের রুক্ষ পরিবেশে টিকে থাকার মতো হার্ডওয়্যার চ্যালেঞ্জগুলো আজও সমান জটিল।
- ল্যান্ডার ও স্পেসস্যুট: আর্টেমিস-৩ বা ৪ মিশনের জন্য প্রয়োজনীয় ল্যান্ডার (যেমন স্পেসএক্স-এর স্টারশিপ) এবং আধুনিক স্পেসস্যুট তৈরির কাজ এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে, যা বিলম্বের অন্যতম কারণ।
২. রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
১৯৬৯ সালে চাঁদে যাওয়া ছিল মূলত স্নায়ুযুদ্ধের একটি রাজনৈতিক বিজয়।
- বাজেট ঘাটতি: ষাটের দশকে মার্কিন বাজেটের ৫ শতাংশ নাসাকে দেওয়া হতো, যা বর্তমানে মাত্র ০.৩৫ শতাংশ।
- পরিবর্তিত অগ্রাধিকার: ১৯৭২ সালের পর নাসা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS) এবং পৃথিবীর নিকট কক্ষপথের গবেষণায় বেশি মনোযোগ দিয়েছিল।
৩. আর্টেমিস বনাম অ্যাপোলো: মূল পার্থক্য
- স্থায়িত্ব (Sustainability): অ্যাপোলো ছিল ‘যাও এবং ফিরে আসো’ ধাঁচের মিশন। কিন্তু আর্টেমিসের লক্ষ্য চাঁদে একটি স্থায়ী ঘাঁটি এবং কক্ষপথে ‘গেটওয়ে’ নামক স্টেশন তৈরি করা।
- অংশীদারিত্ব: নাসা এখন আর একা নয়। ইলন মাস্কের স্পেসএক্স এবং জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিন-এর মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রকল্পের অন্যতম অংশীদার।
- গন্তব্য: এবারের লক্ষ্য চাঁদের দক্ষিণ মেরু, যেখানে বরফ ও খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে।
৪. আর্টেমিস-২ এবং চাঁদের ‘অন্ধকার অংশ’
বর্তমান আর্টেমিস-২ মিশনে রিড ওয়াইজম্যান ও ক্রিস্টিনা কচসহ চার নভোচারী চাঁদে অবতরণ করবেন না, তবে তারা ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছেন।
- সশরীরে পর্যবেক্ষণ: ৫০ বছর পর মানুষ আবার চাঁদের দূরবর্তী বা ‘অন্ধকার অংশ’ (Far side of the Moon) সশরীরে দেখবে।
- যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা: চাঁদের ওপাশ দিয়ে ওড়ার সময় পৃথিবী থেকে নভোযানটির যোগাযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, যা এই অভিযানের অন্যতম রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্ত।
৫. ভবিষ্যতের লক্ষ্য: মঙ্গল গ্রহ
নাসা চাঁদে ফিরে যাওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়াকে দেখছে মঙ্গল গ্রহে (Mars) প্রথম মানববাহী অভিযানের একটি প্রস্তুতি বা ‘টেস্ট বেড’ হিসেবে। ২০২৮ সালে আর্টেমিস-৪ এর মাধ্যমে চাঁদের মাটিতে আবার মানুষের পদচিহ্ন পড়ার পরিকল্পনা থাকলেও প্রযুক্তিগত জটিলতা এই সময়সীমাকে আরও পিছিয়ে দিতে পারে।
পরিশোধিত প্রযুক্তি আর নতুন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার (যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীন) এই যুগে আর্টেমিস কর্মসূচি কেবল একটি ভ্রমণ নয়, বরং মহাকাশ অর্থনীতি ও খনিজ সম্পদ ব্যবহারের এক নতুন দিগন্ত।
সূত্র: বিবিসি



















