ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ১২০ আসনের নেসেটে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পায়নি। ফলে ভোট গণনা শেষ হলেও নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বিকল্প সরকার গঠনের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার দফায় দফায় বৈঠক করেছেন নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের নেতারা। তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে বিরোধীদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় সরকার গঠনের সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) স্থানীয় সময় ভোরে প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। এর মধ্যে তাঁর দল লিকুদ পার্টি এককভাবে পেয়েছে ২৭টি আসন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুবিরোধী শিবির পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরব জোটের দুই দল জয়েন্ট লিস্ট ও রাআম পেয়েছে মোট ১৯টি আসন।
এই দুই দলের সমর্থন পেলে বিরোধী শিবিরের আসনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৬৭টিতে, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে বেশি। তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে বিরোধীদের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য থাকায় চূড়ান্ত সমীকরণ এখনো অনিশ্চিত।
প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বিকল্প সরকার গঠনের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার দফায় দফায় আলোচনায় বসেন বিরোধী শিবিরের নেতারা। ডেমোক্র্যাটস দলের চেয়ারম্যান ইয়ার গোলান আলাদাভাবে রাআম দলের চেয়ারম্যান মনসুর আব্বাস, ইয়াশার পার্টির চেয়ারম্যান গাদি আইজেনকট এবং বি’য়াচাদ দলের নেতা ইয়ার লাপিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
অন্যদিকে, বি’য়াচাদ দলের চেয়ারম্যান নাফতালি বেনেট বৈঠক করেন আইজেনকট ও গোলানের সঙ্গে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করতে আরব দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি এসব আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
টাইমস অব ইসরায়েলের খবরে বলা হয়েছে, সরকার গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট নিয়ে বিরোধীদের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য। ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী চার দলের মধ্যে তিন দল—ইয়াশার, বি’য়াচাদ ও ইসরায়েল বেইতেনু—আরব দলগুলোকে নিয়ে জোট সরকার গঠনে আগ্রহী নয়। ফলে আরব দলগুলোর ১৯ আসন যুক্ত করে সম্ভাব্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ৬৭ হলেও বাস্তবে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কেবল ডেমোক্র্যাটস দলের চেয়ারম্যান গোলান আরব দলগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন।
শুক্রবার ইসরায়েলের উদারপন্থী পত্রিকা হারেৎজে প্রকাশিত এক মতামত কলামে গোলান আরব দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ইসরায়েলে কোনো নাগরিকের নাগরিকত্ব শর্তসাপেক্ষ হতে পারে না। তাঁর যুক্তি, একজন আরব নাগরিকের ভোটের মূল্য একজন ইহুদি নাগরিকের ভোটের সমান। কয়েক লাখ নাগরিকের ভোট শুধু তাঁদের পরিচয় বা নামের কারণে অগ্রাহ্য করা গণতন্ত্রের পরিপন্থী।
নির্বাচনের ফলকে নেতানিয়াহুবিরোধী পক্ষের জয় হিসেবে দেখছেন লাপিদ। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, বিরোধীরা সরাসরি নিরঙ্কুশ জয় আশা করেছিলেন, কিন্তু তা হয়নি। তবে নেতানিয়াহুর জোটের আসন আগের পার্লামেন্টের ৬৮ থেকে কমে ৫৩টিতে নেমেছে। লাপিদের ভাষায়, ব্যবধান কম হলেও বিরোধীরা জিতেছেন। তাঁর মন্তব্য, ‘জয় মানেই জয়।’
লাপিদ আরও বলেন, নেতানিয়াহুর জোটের ৫৩টি আসনের মধ্যে ১৩টি আসন অতি রক্ষণশীল ইহুদি দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দল দুটি নিজেদের জায়নবাদী বলে মনে করে না। এই ১৩ আসন বাদ দিলে নেতানিয়াহুর পক্ষে থাকা বাকি আসনের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০-এ।
এদিকে, নিজেদের ডানপন্থী জোটের ঐক্য ধরে রাখতে তৎপর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও। বৃহস্পতিবার জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ও উগ্র ডানপন্থী ওতজমা ইহুদিতের চেয়ারম্যান ইতামার বেন-গভিরের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন তিনি।
দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান ডানপন্থী সরকার টিকিয়ে রাখা এবং তথাকথিত সন্ত্রাসবাদে সমর্থনকারীদের সমর্থনপুষ্ট কোনো বামপন্থী সরকার গঠন ঠেকানোর বিষয়ে তাঁরা আলোচনা করেন। একই দিন আরেক উগ্র ডানপন্থী দল রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান বেজালেল স্মোট্রিচের সঙ্গেও বৈঠক করেন নেতানিয়াহু। বৈঠকে পরবর্তী পদক্ষেপ সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়। চ্যানেল ১৪-এর বরাতে টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, নেতানিয়াহু শরিকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘আমরা একসঙ্গে আছি, একসঙ্গেই থাকব।’
নেসেটের অধিবেশনের প্রস্তুতি বিরোধীদের
সরকার গঠনের আলোচনার পাশাপাশি নেসেটের অধিবেশনের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন গাদি আইজেনকট। তাঁর দল পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হলে কয়েকটি বিল উত্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সব ইসরায়েলি নাগরিকের জন্য সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ অথবা জাতীয় সেবা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন এবং বাজেট বরাদ্দের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা।
ইসরায়েলের নতুন পার্লামেন্টের শপথ অনুষ্ঠান আগামী ১০ নভেম্বর হওয়ার কথা রয়েছে। সরকার গঠনের আলোচনা তখনো শেষ না হলেও নির্ধারিত দিনেই নতুন নেসেটের শপথ অনুষ্ঠান হবে। তবে জোট গঠনের আলোচনা অত্যন্ত জটিল হতে পারে। দুই মাসের বেশি সময় ধরে আলোচনা চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিরোধীরা আরব দলগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবেন কি না এবং নেতানিয়াহু নিজের জোট ধরে রেখে অন্য দলের সদস্যদের সমর্থন আদায় করতে পারবেন কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশটির পরবর্তী সরকারের ভবিষ্যৎ।
নির্বাচন ঘিরে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ, বাড়ছে রাজনৈতিক বিতর্ক
নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেইতের প্রধান ডেভিড জিনি এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আইজেনকট। তিনি বলেন, বিদেশি হস্তক্ষেপ হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলার সময় এখনো আসেনি। পেশাদার সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে স্বাধীনভাবে তদন্ত শেষ করতে দিতে হবে।
একই সঙ্গে আইজেনকট অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু ও তাঁর দল লিকুদ সমন্বিতভাবে নির্বাচনের ফলাফলের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচার চালাচ্ছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নতুন নেসেটের শপথ অনুষ্ঠান হতে দিতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
শিন বেইত জানিয়েছে, বিদেশি হস্তক্ষেপের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এর পরিসর অত্যন্ত সীমিত। তদন্তের অজুহাতে আইন মেনে ভোট দেওয়া আরব নাগরিকদের সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা ঠিক নয়।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভনেও ব্যাপক নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, নির্বাচন আইন মেনেই অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হওয়ার মতো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সূত্র: জেরুজালেম পোস্ট ও টাইমস অব ইসরায়েল।


















