ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সামনে এসেছে। ইসি সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রকাশ করলেও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।
সোমবার নির্বাচন কমিশনে বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদে সাত ধাপে নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপের ভোট ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপ ২৭ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এটি এখনো চূড়ান্ত সময়সূচি নয়।
‘সরকার কিছুই জানে না’
ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ সম্পর্কে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনের মাধ্যমে তিনি নির্বাচনের তারিখ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে সরকার কিছু জানে না এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কোনো পত্র যোগাযোগ বা অন্য কোনো মাধ্যমে আলোচনা হয়নি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এবং নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক ক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে আলোচনা, প্রস্তুতিমূলক সভা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের পর নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
নির্বাচনের সঙ্গে বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয় জড়িত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইসি যে তারিখগুলো জানিয়েছে, সেগুলো নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বা সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।
ইসি সচিবের বক্তব্য
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেন, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে তিনি সম্মান করেন। তবে এ বিষয়ে পাল্টা কোনো মন্তব্য করতে চান না।
মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশন ভবনে সাংবাদিকদের তিনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে—এটি নিশ্চিত। তবে কখন, কী পদ্ধতিতে এবং কোন পর্যায়ে নির্বাচন হবে, তা নিয়ে কমিশনে গত দুই দিন ধরে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।
ইসি সচিব বলেন, একটি প্রাথমিক সময়সূচি তৈরি করা হয়েছে। সেখানে পাঁচ ধাপে নির্বাচন আয়োজনের কথা রয়েছে এবং পাশাপাশি দুটি ধাপ রিজার্ভ রাখা হয়েছে। তবে এটিও একেবারেই প্রাথমিক পরিকল্পনা।
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত অংশীজনদের নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হবে। শিক্ষামন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় মতামত নেওয়া হবে। এরপর এসব মতামতের ভিত্তিতে কমিশন নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করবে।
সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, আলোচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। কার সঙ্গে কখন এবং কীভাবে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে এ মুহূর্তে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চান না তিনি।
‘সম্ভাব্য সূচি, চূড়ান্ত নয়’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
১২ নভেম্বর থেকে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনাকে ‘সম্ভাব্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী কাজ করে। জাতীয় সংসদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি আইনে দেওয়া অন্যান্য নির্বাচনসংক্রান্ত দায়িত্বও কমিশনের রয়েছে।
স্থানীয় সরকার আইনের আওতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন। ইসি যে দিনক্ষণ জানিয়েছে, সেটি চূড়ান্ত নয়; এটি একটি ‘টেনটেটিভ প্ল্যান’ বা সম্ভাব্য পরিকল্পনা।
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সচিবদের অংশগ্রহণে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়ার পর ভবিষ্যতের নির্বাচনের সময়সূচি সাজানো হবে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার পরই নির্বাচনের সূচি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে, সে সিদ্ধান্ত সরকার নেবে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের একক এখতিয়ার নেই; সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয় করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তবে নির্বাচন যে হবে, এ বিষয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই বলেও জানান তিনি। সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি সময়সীমা অনুসরণ করে নির্বাচন আয়োজন করা হবে বলে উল্লেখ করেন তথ্য উপদেষ্টা।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকের দিকে নজর
ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে বৃহস্পতিবারের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার দিকে নজর রয়েছে।
সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পর নির্বাচন কমিশন সময়সূচি চূড়ান্ত করবে বলে জানিয়েছে। ফলে ১২ নভেম্বর প্রথম ধাপের ভোটসহ সাত ধাপের যে সময়সূচি প্রকাশ করা হয়েছে, তা আপাতত সম্ভাব্য পরিকল্পনা হিসেবেই থাকছে।


















