কক্সবাজারের উখিয়ায় ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসের এক মর্মান্তিক ঘটনায় পাঁচ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আজ বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে ঘটা এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্যাম্পের একটি মাদ্রাসার ভেতরে এখনও প্রায় ৩০ জন শিশু আটকা পড়ে রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। খবর পেয়ে উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে। উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ডলার ত্রিপুরা পাহাড় ধসে ৫ শিশুর মৃত্যু ও মাদ্রাসায় আটকা পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এই নতুন ৫ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জেলায় গত তিন দিনে পাহাড় ও দেয়াল ধসে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে দাঁড়াল।
টানা বর্ষণে কক্সবাজারের নয় উপজেলা প্লাবিত ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
গত কয়েকদিনের টানা অতি ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে পুরো কক্সবাজার জেলার জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জেলার নয়টি উপজেলার অর্ধশতাধিক ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা ইতোমধ্যে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও বিভিন্ন নদ-নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ঈদগাঁও, রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও টেকনাফের লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন।
| এলাকার নাম | মৃত্যুর ধরন ও বিবরণ |
| ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প (আজ) | পাহাড় ধসে ৫ শিশুর মৃত্যু; মাদ্রাসায় ৩০ শিশু আটকা। |
| উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প (সোমবার রাত) | পৃথক পাহাড় ধসে ৮ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু। |
| উখিয়া হলদিয়াপালং (মঙ্গলবার) | অতিবৃষ্টিতে মাটির ঘরের দেয়াল ধসে মানিকের (৪০) মৃত্যু। |
| সদর উপজেলার ঝিলংজা (মঙ্গলবার) | বড়ছড়া এলাকায় পাহাড় ধসে নাছিমা আক্তার লিমার (২৭) মৃত্যু; স্বামী আহত। |
| কক্সবাজার শহর ও পেকুয়া (সোমবার রাত) | শহরে পাহাড় ধসে ১ জন এবং পেকুয়ায় মাটির ঘর ধসে ১ শিশুর মৃত্যু। |
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বন্যা ও ভূমিধসের ভয়াবহ পরিসংখ্যান
রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্মের (আরসিপি) তথ্যমতে, গত ৪ জুলাই থেকে ৭ জুলাই সকাল পর্যন্ত উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
- প্রাণহানি ও আহত: ক্যাম্পে আজ দুপুরের ঘটনার আগে পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যু ও ১০ জন আহত হয়েছিলেন।
- ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত: ১৫ হাজার ৮১৩ জন রোহিঙ্গা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ৩ হাজার ১৮২ জন সম্পূর্ণ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
- দুর্যোগজনিত ঘটনা: ক্যাম্পগুলোতে মোট ১৬০টি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৫২টি ভূমিধস, ১৪টি আকস্মিক বন্যা এবং ৮৩টি ঝড়ের ঘটনা রয়েছে।
- আশ্রয়ণ কেন্দ্র ধ্বংস: ১ হাজার ৬১৪টি রোহিঙ্গা বসতঘর আংশিক এবং ১০টি আশ্রয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
৩৩ ঘণ্টায় ১৭৬ মিমি বৃষ্টিপাত: আরও পাহাড় ধসের আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানিয়েছেন, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ভোর ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। এরপর ভোর ৬টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত আরও ৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। সব মিলিয়ে মাত্র ৩৩ ঘণ্টায় জেলায় ১৭৬ মিলিমিটার অতি ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
আবহাওয়া অফিস আরও সতর্ক করেছে যে, মৌসুমী বায়ুর সক্রিয়তার কারণে আগামী দুই থেকে তিন দিনও কক্সবাজার ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় এই ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত মানুষের জন্য পাহাড়ধস ও ভূমিধসের ঝুঁকি আরও মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসন থেকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে থাকা বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।


















