শ্রীলঙ্কার একটি প্রধান কারাগারে বন্দিদের দুটি শক্তিশালী মাদক চক্রের মধ্যে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৪ জন কারারক্ষী রয়েছেন এবং এই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন ১০০ জনেরও বেশি বন্দি। দেশটির কারা প্রশাসন ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, বিগত ৫ বছরের মধ্যে এটিই শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে সবচেয়ে বর্বর ও ভয়াবহ কারাদাঙ্গার ঘটনা। আজ সোমবার (৬ জুলাই) স্থানীয় পুলিশ জানায়, রাজধানী কলম্বোর উত্তরে নেগোম্বো অঞ্চলের প্রধান কারাগারে রবিবার রাতভর এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত নেগোম্বো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে হাসপাতালটির পরিচালক পুষ্পা গামলাথ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপি-কে জানান, হাসপাতালে আনার পর ২৩ জনকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। ভুক্তভোগী বন্দি ও রক্ষীদের শরীরে স্পষ্ট গুলির দাগ ও ধারালো দেশীয় অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
সংঘর্ষের সূত্রপাত ও ছাদ ধসে নারী কয়েদিদের আর্তনাদ
শ্রীলঙ্কার জনপ্রিয় স্থানীয় গণমাধ্যম ‘আদা দেরানা’ (Ada Derana)-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারাগারের ভেতর মাদক চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রবিবার দুপুর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল বিবাদ শুরু হয়, যার জেরে দুপুরের দিকেই ২ জন বন্দি নিহত হন। এরপর মধ্যরাতে নতুন করে পুরো কারাগারে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। বন্দিদের মধ্যে গোলাগুলি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাণ্ডব শুরু হলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সাধারণ কয়েদিরা। খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নিজেদের জীবন বাঁচাতে কারাগারের নারী সেকশনে থাকা কয়েদিরা হুড়োহুড়ি করে ভবনের ছাদে উঠে বাঁচার আকুতি জানাতে থাকেন। কিন্তু অতিরিক্ত মানুষের ওজনের কারণে এক পর্যায়ে ছাদের একটি বড় অংশ ধসে নিচে পড়ে যায় এবং এতে বেশ কয়েকজন নারী কয়েদি গুরুতর আহত হন।
নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কমান্ডো ও ধারণক্ষমতার ৪ গুণ কয়েদি সংকট
পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আবাসন ও কারা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সোমবার সকালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শ্রীলঙ্কার বিশেষ পুলিশ কমান্ডো বাহিনীকে (STF) কারাগারে তলব করা হয়। আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সকাল পর্যন্ত কারাগারের ভেতর থেকে অবিরাম ভারী গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। দীর্ঘ অভিযানের পর কমান্ডোরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। এদিকে সংঘর্ষের খবর শুনে কয়েদিদের শত শত উদ্বিগ্ন স্বজন কারাগারের প্রধান ফটকের বাইরে এসে ভিড় জমান।
উল্লেখ্য, প্রায় ৫ বছর আগে ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়েও শ্রীলঙ্কার একটি কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দি রাখার প্রতিবাদে ব্যাপক সংঘর্ষে ১১ জন নিহত হয়েছিলেন। সেই ঘটনার পর সরকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপে কারাগারগুলোর ওপর চাপ কমাতে শত শত কয়েদিকে সাধারণ ক্ষমা বা জামিন দিয়ে মুক্তি দিয়েছিল। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ভয়াবহ দাঙ্গা লাগার আগ পর্যন্ত (রবিবার) কারাগারটিতে ৪১,২৫০ জন বন্দি আটক ছিলেন, যা এর মূল ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি। এই ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ভিড় এবং মাদক সিন্ডিকেটের অবাধ বিচরণই এই ট্র্যাজেডির মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

















