কক্সবাজারে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা রেকর্ডভাঙা প্রবল বর্ষণের জেরে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের একটি স্থানীয় এলাকা সহ মোট পাঁচটি পৃথক স্থানে ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। রবি ও সোমবারের (৫ জুলাই ও ৬ জুলাই) মধ্যরাত থেকে ভোররাতের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই ধারাবাহিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাটি চাপা পড়ে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুস্পষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই অঞ্চলজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫০ মিলিমিটারের বেশি রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে, যার কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে এই ভয়াবহ ধসের সূত্রপাত ঘটে।
উখিয়ার ৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধস: ৮ রোহিঙ্গার মৃত্যু
উখিয়া উপজেলা ও ক্যাম্প প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, রবিবার দিবাগত গভীর রাতে উখিয়ার তিনটি ভিন্ন ক্যাম্পে পাহাড় ধসের ঘটনায় মোট ৮ জন রোহিঙ্গা নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন:
- ১৫নং জামতলী ক্যাম্প: রাত আনুমানিক ১টা ১০ মিনিটের দিকে পালংখালী ইউনিয়নের ১৫নং জামতলী ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে পাহাড়ের বিশাল মাটির স্তূপ আশ্রিত মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর ভেঙে পড়ে। উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। তারা কামাল হোসাইন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাঁদের ৪ বছর বয়সী শিশুসন্তান মোহাম্মদ আনাসের মরদেহ উদ্ধার করেন। এই ঘটনায় আরও দুইজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
- ৭নং কুতুপালং ক্যাম্প: রাত ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা মাটির নিচে চাপা পড়ে একরাম নামের ৭ বছরের এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়। ক্যাম্পের মাঝি এনায়েত উল্লাহ জানান, ঘটনার পরপরই রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকরা মাটির নিচ থেকে শিশুটির মৃতদেহ উদ্ধার করে। নিহত একরাম ওই ক্যাম্পের মোহাম্মদ রশিদের ছেলে।
- ১১নং বালুখালী ক্যাম্প: রাত ৩টার দিকে উপজেলার বালুখালী ১১নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে আরেকটি বড় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এতে দুই নারী ও দুই শিশুসহ একই ব্লকের ৪ জনের মৃত্যু হয় এবং ১ জন গুরুতর আহত হন। নিহতরা হলেন—আব্দুর রাজ্জাকের দুই মেয়ে উম্মে হাবিবা (২৭) ও তানজিনা আক্তার (১৩), এবং মোহাম্মদ রশিদের দুই শিশুসন্তান মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)।
কক্সবাজার শহরে পাহাড় ধসে ১ জনের মৃত্যু ও প্রশাসনের মাইকিং
উখিয়ার বাইরে সোমবার ভোররাত ৪টার দিকে কক্সবাজার শহরের ১২নং ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড় ধসে এক স্থানীয় বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। ভোররাতে পাহাড়ের মাটির একটি বড় অংশ ধসে একটি বসতঘরের ওপর পড়লে একই পরিবারের তিনজন মাটির নিচে চাপা পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দারা তাৎক্ষণিকভাবে মাটির স্তূপ সরিয়ে তিনজনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও উদ্ধারকৃত আলী আকবরের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ছিল। তাকে দ্রুত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানিয়েছেন, অবিরত ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে নতুন করে ধসের চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে বা সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসন ও ক্যাম্প সিপিপি স্বেচ্ছাসেবকদের পক্ষ থেকে উপুর্যপরি মাইকিং করা হচ্ছে। তিনি পাহাড়ের ঢালে বসবাসরত সবাইকে জানমালের ক্ষতি এড়াতে প্রশাসনের নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার উদাত্ত আহ্বান জানান।
আরও দুই দিন ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, সমুদ্রের লঘুচাপের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এই বৈরী আবহাওয়া এবং অতি ভারী বর্ষণের ধারা আগামী আরও দুই দিন অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে পাহাড় ধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে সাগরে থাকা মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকাগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।


















