রাজধানীর গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নৃশংস জঙ্গি হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো আজ বুধবার (১ জুলাই)। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে একদল সশস্ত্র আত্মঘাতী জঙ্গি ওই রেস্তোরাঁয় হামলা চালিয়ে দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে এবং অত্যন্ত বর্বরভাবে কুপিয়ে ও গুলি করে ২২ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে ১৮ জনই ছিলেন বিদেশি নাগরিক, যার মধ্যে ইতালির ৯ জন, জাপানের ৭ জন এবং ভারতের ১ জন রয়েছেন। বাকি ৩ জন ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক। এছাড়া জিম্মিদের মুক্ত করতে গিয়ে প্রারম্ভিক প্রতিরোধে নব্য জেএমবি ($Neo\text{-}JMB$)-এর আকস্মিক গ্রেনেড ও বোমা হামলায় বনানী থানার তৎকালীন ওসি সালাহউদ্দিন খান এবং ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল ইসলাম নামের দুই বীর পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডোদের পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ ($Operation\text{-}Thunderbolt$)-এ ৫ আত্মঘাতী জঙ্গি নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটেছিল।
বিচারিক প্রক্রিয়া ও হাইকোর্টের রায়: মৃত্যুদণ্ড থেকে আমৃত্যু কারাদণ্ড
হোলি আর্টিজান হামলার পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গুলশান থানায় দায়েরকৃত মামলাটি তদন্ত করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ($CTTC$) ইউনিট ২০১৮ সালের ১ জুলাই আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল হামলার পটভূমি ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ‘নব্য জেএমবি’র ৭ সদস্যকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন।
পরবর্তীতে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায় সংশোধন করে ৭ আসামিকে ‘আমৃত্যু কারাদণ্ড’ ($Imprisonment\ till\ natural\ death$) প্রদান করেন। ২০২৪ সালের ১৭ জুন প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট উল্লেখ করেন যে, আসামিরা সরাসরি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলেও হামলার মূল পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অপরাধে সরাসরি সহায়তা করেছেন, যা সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ধারা ৬ অনুযায়ী সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। তবে ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট ধারার সঠিক আইনি ব্যাখ্যা না করে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা এবং আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আসামিদের আমৃত্যু কারাদণ্ডসহ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়।
আসামিদের বর্তমান অবস্থা ও আপিল বিভাগের শুনানি
হাইকোর্টের রায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৭ আসামি হলেন: রাকিবুল হাসান রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন এবং শরিফুল ইসলাম খালেদ।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বর্তমান আইনি ও শারীরিক অবস্থা
┌─────────────────────────────────┬─────────────────────────────────┐
│ আসামির নাম │ বর্তমান অবস্থা │
├─────────────────────────────────┼─────────────────────────────────┤
│ আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ │ ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট কাশিমপুর │
│ │ কারাগার থেকে পালানোর চেষ্টাকালে │
│ │ নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত। │
├─────────────────────────────────┼─────────────────────────────────┤
│ বাকি ৬ জন আসামি │ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় কারাগারে │
│ (রিগ্যান, রাজীব গান্ধী প্রমুখ) │ কঠোর নজরদারিতে বন্দি আছেন। │
└─────────────────────────────────┴─────────────────────────────────┘
কারাগারে বন্দি থাকা জীবিত ৬ জন আসামি গত বছরের মে মাসে হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে এবং নিজেদের সম্পূর্ণ খালাস দাবি করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৪টি পৃথক লিভ-টু-আপিল ($Leave\ to\ Appeal$) দায়ের করেছেন। এক দশকের মাথায় এসে এই চাঞ্চল্যকর মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য বিষয়টি এখন আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।


















