বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক রায়ে বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধারা অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ। এর ফলে দেশের সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এবং গণভোট (Referendum) পুনরুজ্জীবিত বা পুনর্বহাল হলো বলে নিশ্চিত করেছেন মামলার সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই, ২০২৬) সকাল সাড়ে ৯টায় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের পূর্ববর্তী রায়ের বিরুদ্ধে রিটকারীদের দায়ের করা আপিল আবেদনটি সর্বোচ্চ আদালত খারিজ করে দেওয়ায় এই রায় এখন চূড়ান্তভাবে কার্যকর হলো।
সর্বোচ্চ আদালতে শুনানির আবহ ও ঐতিহাসিক রায়
আদালতে আজ ঐতিহাসিক এই শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। অন্যদিকে, মূল রিট আবেদনকারী সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে লড়েছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। রায়ের পর এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির এই রায়কে দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ইতিহাসে একটি ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেন। এর আগে টানা তিন দিন ব্যাপী দীর্ঘ ও নিবিড় শুনানি শেষে গতকাল বুধবার প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ রায়ের জন্য আজকের দিনটি (৯ জুলাই) ধার্য করেছিলেন।
হাইকোর্টের রায়ের মূল পর্যবেক্ষণ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যোগসূত্র
বিগত বছরের ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ পঞ্চদশ সংশোধনীর আংশিক অংশ বাতিল করে রায় দিয়েছিলেন। সেই রায়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলো সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগেও আজ সমুন্নত রাখা হলো:
- গণতন্ত্র ও দলীয় সরকার: হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, গণতন্ত্র হচ্ছে আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা একমাত্র অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিকশিত হয়। তবে বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ায় সেখানে জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি।
- জুলাই গণঅভ্যুত্থান: দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতি জনগণের আস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়ার চূড়ান্ত ফলশ্রুতি হিসেবেই দেশে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ সংঘটিত হয়েছিল।
- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইনি বৈধতা: আদালত রায়ে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জনগণের তীব্র অভিপ্রায় ও আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল এবং এটি মূলত সংবিধানের মৌলিক কাঠামোরই অংশে পরিণত হয়েছে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর যেসব অনুচ্ছেদ বাতিল ও বহাল হলো
২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে মোট ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল। আজকের রায়ের ফলে এর একটি বড় অংশ বাতিল হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বহাল রাখা হয়েছে:
| বাতিলের আওতাভুক্ত অনুচ্ছেদসমূহ | আইনি প্রভাব ও বর্তমান স্থিতি |
| অনুচ্ছেদ ২০ ও ২১ (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) | এই অনুচ্ছেদ দুটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় সম্পূর্ণ বাতিল। ফলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হলো। |
| অনুচ্ছেদ ১৪২ (গণভোট বিলুপ্তি সংক্রান্ত ৪৭ ধারা) | গণভোটের বিধান বাতিলের সিদ্ধান্তকে আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছেন। এর ফলে সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর গণভোটের নিয়ম আবার ফিরে এলো। |
| অনুচ্ছেদ ৭ক, ৭খ এবং ৪৪ (২) | সংবিধান অবৈধকরণ ও মৌলিক বিধান সংশোধন অযোগ্য করার ধারা (৭খ) এবং মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ সংক্রান্ত বিধি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। |
| বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি ও ভাষণের পরিচ্ছেদ (বহাল) | পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিল না করায় শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি এবং ২৬ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মতো বিষয়গুলো সংবিধানে অক্ষুণ্ণ থাকবে। |
সর্বোচ্চ আদালত তাঁর রায়ের শেষে উল্লেখ করেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর বাকি যে সকল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিধান রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে আগামীতে দেশের নির্বাচিত নতুন জাতীয় সংসদ প্রচলিত আইন অনুসরণে এবং জনগণের সরাসরি মতামত বা ম্যান্ডেট নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন, পরিমার্জন বা পরিবর্তন করতে পারবে। এই রায়ের মাধ্যমে দেশের নির্বাচনকালীন সংকটের একটি স্থায়ী আইনি সমাধান মিলবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।


















