আগামী ২০২৮ সাল থেকে দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের রূপান্তর এনে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার. এই নতুন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বর্তমান পাঠ্যসূচিতে সম্পূর্ণ নতুন চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন. সোমবার (৮ জুন) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই যুগান্তকারী পরিবর্তনগুলোর ঘোষণা দেন. নতুন যুক্ত হতে যাওয়া বিষয়গুলো হলো—আনন্দময় শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা. এছাড়া শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে বাংলা ও ইংরেজির বাইরে তৃতীয় আরও একটি আন্তর্জাতিক ভাষা শেখানোর পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে সরকার.
নতুন বিষয়সমূহের স্তরভিত্তিক বিন্যাস ও রূপরেখা
শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিক বিকাশ বিবেচনা করে নতুন বিষয়গুলোকে দুটি ভিন্ন স্তরে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে:
- চতুর্থ শ্রেণি থেকে (খেলাধুলা ও সংস্কৃতি): প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, বর্তমানে স্কুলগুলোতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালু থাকলেও তা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্রমের অংশ নয়. নতুন ব্যবস্থায় এগুলোকে সরাসরি পাঠ্যসূচির আওতায় আনা হবে. খেলাধুলার মধ্যে প্রাথমিকভাবে ফুটবল ও দাবা দিয়ে শুরু করা হবে এবং পরবর্তীতে ক্রিকেটসহ অন্যান্য খেলা যোগ হবে. সংস্কৃতি বিষয়টিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে—’পারফরমেটিভ’ (গান, নাচ, আবৃত্তি, বিতর্ক, বক্তৃতা) এবং ‘এক্সপ্রেসিভ’ (চিত্রাঙ্কন, সাহিত্যচর্চা ও সৃজনশীল প্রকাশ). শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব আগ্রহ অনুযায়ী যেকোনো ক্ষেত্র বেছে নিতে পারবে.
- ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে (কারিগরি ও আনন্দময় শিক্ষা): ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মূলধারায় আনার লক্ষ্যে তা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে. প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, প্রতিটি স্কুলে পর্যায়ক্রমে কারিগরি ল্যাব স্থাপন করা হবে, যাতে স্কুল পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীরা স্বাবলম্বী হওয়ার কারিগরি দক্ষতা অর্জন করতে পারে. এর পাশাপাশি ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই যুক্ত হবে ‘আনন্দময় শিক্ষা’ বা ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’. এটি কেবল একটি সাধারণ পাঠ্যবিষয় নয়, বরং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক আচরণ, দায়িত্ববোধ ও মানবাধিকারের ধারণা দেওয়া হবে এবং ব্যবহারিক কাজের মাধ্যমে (যেমন: বৃক্ষরোপণ, জাতীয় দিবসের তাৎপর্য অনুধাবন) এর চর্চা করানো হবে.
বাস্তবায়ন পরিকল্পনা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি
এই বিশাল শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের সুফল নিশ্চিত করতে সরকার একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করেছে, যার মূল দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- পাইলট প্রকল্প: নতুন শিক্ষাক্রমের কার্যকারিতা যাচাই করতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে কিছু স্কুলে পরীক্ষামূলকভাবে বিষয়গুলো চালু করা হবে. এই পাইলট প্রকল্পের বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ২০২৮ সালে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাক্রম চূড়ান্ত করা হবে.
- শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ: নতুন বিষয়গুলো সফলভাবে পড়ানোর জন্য দেশে বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষিত শিক্ষকের প্রয়োজন হবে. এই লক্ষ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে বিশেষ ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ এবং সংস্কৃতি শিক্ষার জন্য দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে. এছাড়া ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বিষয়ের জন্য আলাদা শিক্ষক নির্দেশিকা তৈরি ও ধাপে ধাপে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে.
- জিপিএ মুক্ত মূল্যায়ন পদ্ধতি: শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে পড়াশোনার অতিরিক্ত মানসিক চাপ কমাতে এই নতুন যুক্ত হওয়া বিষয়গুলোতে প্রথাগত কোনো গ্রেড বা জিপিএ (GPA) ব্যবস্থা থাকবে না. শিক্ষার্থীদের মেধা ও অংশগ্রহণ বিবেচনা করে কেবল ‘পাস’ বা ‘ফেল’—এই দুই ভিত্তির ওপর নির্ভর করে তাদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা হবে.


















