আগামী নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই অর্থাৎ ১ জুলাই (২০২৬) থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নতুন বেতনকাঠামো বা পে-স্কেল বাস্তবায়ন শুরু হতে যাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশই চূড়ান্তভাবে আমলে নিচ্ছে বর্তমান বিএনপি সরকার। কমিটির প্রধান সুপারিশ অনুযায়ী, তিন অর্থবছরে মোট তিন ধাপে এই নতুন বেতনকাঠামো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে প্রথম দুই অর্থবছরে সরকারি কর্মচারীদের বর্ধিত মূল বেতনের (Basic Salary) ৫০ শতাংশ করে প্রদান করা হবে এবং চূড়ান্ত তথা তৃতীয় অর্থবছরে অন্যান্য নতুন ভাতা যোগ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের নীতিমালায় ইতিমধ্যেই তাঁর নীতিগত সম্মতি প্রদান করেছেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল বাজেটে এই বর্ধিত মূল বেতনের প্রথম ৫০ শতাংশের বরাদ্দ নিশ্চিত করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
কমিশন গঠন ও তিন ধাপে বাস্তবায়নের নেপথ্য রূপরেখা: উল্লেখ্য, সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি যুগোপযোগী ও সম্মানজনক নতুন বেতনকাঠামো তৈরির লক্ষ্যে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের একটি শক্তিশালী ‘বেতন কমিশন’ গঠন করা হয়েছিল। এই কমিশন গত ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিস্তারিত সুপারিশসংবলিত একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। পরবর্তীতে গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন-উত্তর বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই বেতন কমিশনের সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত ২৩ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। এই কমিটিই মূলত দেশের মুদ্রাস্ফীতি ও রাজস্ব খাতের ওপর চাপ কমাতে তিন ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের এই কৌশলগত সুপারিশ পেশ করে।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময়সীমা ও রূপরেখা:
┌─────────────────────────┐ ┌─────────────────────────┐ ┌─────────────────────────┐
│ ১ম ধাপ (১ জুলাই ২০২৬) │ ───> │ ২য় ধাপ (১ জুলাই ২০২৭) │ ───> │ ৩য় ধাপ (১ জুলাই ২০২৮) │
│ মূল বেতনের ৫০% প্রদান │ │ মূল বেতনের বাকি ৫০% │ │ সকল নতুন ভাতা কার্যকর │
└─────────────────────────┘ └─────────────────────────┘ └─────────────────────────┘
সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন এবং গ্রেড বিন্যাস: প্রস্তাবিত নতুন এই বেতনকাঠামোতে পদমর্যাদা অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির ঐতিহাসিক সুপারিশ করা হয়েছে। তবে গ্রেড বা ধাপের সংখ্যা পূর্বের মতোই ২০টি বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। নতুন পে-স্কেলে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন বর্তমানের ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে একলাফে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার জোর সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, কাঠামোর সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন বর্তমানের ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে নির্ধারিত ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এবং সরকারের সিনিয়র সচিবদের জন্য এই ২০টি ধাপের বাইরে একটি বিশেষ স্কেল বা উচ্চতর ধাপ তৈরি করবে অর্থ বিভাগ, যা পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রজ্ঞাপন (গ্যাজেট) আকারে জারি করা হবে।
ভাতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা সুবিধা ও পেনশনভোগীদের সুখবর: অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন কাঠামোয় মূল বেতন বাড়ার ফলে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতার আর্থিক অঙ্কও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীরা এত দিন মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে যে বৈশাখী ভাতা পেয়ে আসছিলেন, তা বাড়িয়ে একযোগে ৫০ শতাংশ করার জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে। যাতায়াত ভাতার ক্ষেত্রেও আওতা বাড়ানো হয়েছে; আগে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা এই সুবিধা পেলেও নতুন নিয়মে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা যাতায়াত ভাতা পাবেন।
সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি দেশের অবলুপ্ত ও বর্তমান পেনশনভোগীদের জন্যও পেনশনের হার শতভাগের বেশি বৃদ্ধির চমৎকার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে যাঁরা বর্তমানে মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাঁদের পেনশন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। যাঁরা ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশন পান, তাঁদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে তা ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রবীণ পেনশনভোগীদের কল্যাণে ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য মাসিক চিকিৎসা ভাতা ১০ হাজার টাকা এবং ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য মাসিক চিকিৎসা ভাতা ৮ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে, যা আগামী বাজেট অধিবেশনেই চূড়ান্ত রূপ পাবে।



















