দেশের ভোজ্যতেলের বাজারে ৫-৬টি বড় কোম্পানির সিন্ডিকেটের কারণে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে খুচরা বাজারে সয়াবিন তেলের দাম আকাশচুম্বী করা হয়েছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যের তোয়াক্কা না করে মিলমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন নতুন করে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ায় সাধারণ ভোক্তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
বাজারের বর্তমান অরাজকতা এবং সরকার ও ব্যবসায়ীদের অবস্থানের মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মালিক সমিতির প্রস্তাবিত বনাম বর্তমান দাম
সরকারের অনুমতি পাওয়ার আগেই মিলমালিকরা বৃহস্পতিবার থেকে নতুন দাম কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের প্রস্তাবিত দামের তালিকা নিম্নরূপ:
| পণ্যের ধরন | বর্তমান নির্ধারিত মূল্য | প্রস্তাবিত/কার্যকর মূল্য | বৃদ্ধির পরিমাণ |
| ১ লিটার বোতলজাত সয়াবিন | ১৯৫ টাকা | ২০৭ টাকা | ১২ টাকা |
| ৫ লিটার বোতলজাত সয়াবিন | ৯৫৫ টাকা | ১,০২০ টাকা | ৬৫ টাকা |
| খোলা সয়াবিন (লিটার) | ১৭৬ টাকা | ১৮৫ টাকা | ৯ টাকা |
| পাম তেল (লিটার) | ১৬৪ টাকা | ১৭৭ টাকা | ১৩ টাকা |
বাস্তবতা: খুচরা বাজারে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। খোলা সয়াবিন তেল বর্তমানে ২১০ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩৪ টাকা বেশি।
২. কৃত্রিম সংকট ও ডিলারদের কারসাজি
রাজধানীর নয়াবাজার, মালিবাগ ও বাড্ডা এলাকার বাজারগুলোতে ১ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল কার্যত উধাও হয়ে গেছে। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ:
- ডিলাররা দোকানে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন এবং নতুন অর্ডার নিচ্ছেন না।
- কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে, নতুন বর্ধিত মূল্য কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বাজারে তেল ছাড়া হবে না।
- সরবরাহ বন্ধ রাখার সরাসরি হুমকি দিয়েছে মিলমালিকদের সংগঠন।
৩. র্যাবের অভিযান ও মজুত উদ্ধার
বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) তাদের অভিযান জোরদার করেছে। বৃহস্পতিবার পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়:
- দেশের বিভিন্ন স্থানে ৯টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার ১৭৩ লিটার ভোজ্যতেলের অস্বাভাবিক মজুত উদ্ধার করা হয়েছে।
- নিয়ম না মানায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোট ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
৪. সরকারের অবস্থান ও রোববারের বৈঠক
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মনে করছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমান যে দর রয়েছে, তাতে দেশের বাজারে নতুন করে দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। পরিস্থিতি সামাল দিতে আগামী রোববার (১২ এপ্রিল) ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর আগে নভেম্বর ও ডিসেম্বরেও ব্যবসায়ীরা সরকারকে এক প্রকার বাধ্য করে দাম বাড়িয়েছিল, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।
৫. ক্যাব ও ব্যবসায়ীদের পাল্টাপাল্টি যুক্তি
- ক্যাব (CAB): কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর মতে, বাজার তদারকিতে কঠোরতা না থাকায় সিন্ডিকেট বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তারা বাজার ব্যবস্থাপনাকে আমূল পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন।
- ব্যবসায়ী (টিকে গ্রুপ): তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম টন প্রতি ১১০০ ডলার থেকে ১৩৭০ ডলারে উন্নীত হওয়ায় তারা লোকসান গুনছেন। সমন্বয় না করলে ব্যবসা পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ছুটির দিনেও সংসদের অধিবেশন চলায় আশা করা হচ্ছে, জনগুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়ে সংসদে আজ আলোচনা হতে পারে। বাণিজ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যে বাজার পরিদর্শন করে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছেন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।



















