কৌশলগতভাবে বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকার আজ চার সপ্তাহ পূর্ণ হলো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই অচলাবস্থার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং খাদ্য উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য সারের সরবরাহ ব্যবস্থায় চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বর্তমানে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অবরোধ ভাঙতে মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছেন, যা ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক সমাবেশ।
বর্তমান পরিস্থিতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
- ইরানের ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা: গত ১৩ মার্চ থেকে ইরান এই প্রণালিতে একটি অনানুষ্ঠানিক ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে। লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স-এর তথ্যমতে, প্রণালিটি পার হওয়ার জন্য জাহাজগুলোকে পূর্ণ নথিপত্র জমা দিতে হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট করিডোর দিয়ে ইরানি পাহারায় (Escort) যাওয়ার বিনিময়ে অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। অন্তত দুটি জাহাজ ইতিমধ্যে চীনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এ এই টোল পরিশোধ করে পার হয়েছে।
- কূটনৈতিক ছাড়: ইরান এই প্রণালিকে সবার জন্য বন্ধ ঘোষণা করলেও ভারত, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান ও ইরাকের মতো ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ দেশগুলোর জাহাজকে বিশেষ বিবেচনায় চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের ৫টি জাহাজ এই বিশেষ সুবিধায় নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছেছে।
- মার্কিন সামরিক অবস্থান ও আল্টিমেটাম: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই অবরোধকে ‘বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ইতিমধ্যে ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালানোর হুমকি দিলেও আলোচনার সুযোগ দিতে সেই সময়সীমা আরও ১০ দিন বাড়িয়ে আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত নির্ধারণ করেছেন।
- অপ্রচলিত যুদ্ধপদ্ধতি: সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান এবং তাদের সস্তা ড্রোন ও সমুদ্রমাইনের (Sea Mines) ব্যবহারের কারণে এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি মার্কিন নৌবাহিনীর পাহাড়ায় জাহাজ পার করে দেওয়াও বর্তমানে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করেছেন যে, এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বৈশ্বিক রোপণ মৌসুমে সার সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট তৈরি করতে পারে। বর্তমানে মায়েস্ক (Maersk) ও এইচএলএ-র (Hapag-Lloyd) মতো বড় জাহাজ কোম্পানিগুলো হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে যাতায়াত করছে, যা খরচ ও সময় উভয়ই বাড়িয়ে দিয়েছে।



















