আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তা মূলত তিনটি প্রধান মেরুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। আপনার অনুরোধ অনুযায়ী এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে অনুচ্ছেদ আকারে দেওয়া হলো:
বিএনপি ও জামায়াতের আদর্শিক ও কৌশলগত দূরত্ব দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এখন দুটি পৃথক নির্বাচনী বলয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এক সময় আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলন এই দুই দলকে ‘আঁঠা’র মতো আটকে রাখলেও, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সেই সমীকরণ বদলে গেছে। বিএনপি বর্তমানে একটি লিবারেল ডেমোক্রেটিক বা উদার গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যেখানে তারেক রহমানের ঘোষিত ‘৩১ দফা’ সংস্কার প্রস্তাবকে মূল ভিত্তি ধরা হয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী নিজেদের একটি শক্তিশালী স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ১০টি সমমনা দলকে নিয়ে নিজস্ব জোট গঠন করেছে। দুই দলের মধ্যে সংবিধান সংস্কার এবং নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে প্রকাশ্য মতবিরোধ এখন নির্বাচনী লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।
জোট সমীকরণ ও আসন বণ্টন নির্বাচনী মাঠে এখন তিনটি প্রধান পক্ষ সক্রিয়। প্রথম পক্ষে রয়েছে বিএনপি ও তাদের যুগপৎ আন্দোলনের ১৬টিরও বেশি শরিক দল, যারা অধিকাংশ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছে। দ্বিতীয় পক্ষে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে ১১ দলীয় নির্বাচনী জোট, যার মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), খেলাফত মজলিস এবং এবি পার্টির মতো দলগুলো রয়েছে। এই জোট ইতিমধ্যে ২৫৩টি আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে, যেখানে জামায়াত ১৭৯টি এবং এনসিপি ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। তবে আদর্শিক দ্বন্দ্বে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এই জোট থেকে বেরিয়ে এসে ২৬৮টি আসনে এককভাবে লড়ার ঘোষণা দিয়েছে। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে রয়েছে জাতীয় পার্টির একাংশ, বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী।
তরুণ ভোটার ও এনসিপি-র অবস্থান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে আসা তরুণ ভোটাররা এবারের নির্বাচনে একটি বড় ফ্যাক্টর। ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে জোট করায় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এনসিপি-র প্রধান নাহিদ ইসলাম একে ‘কৌশলগত নির্বাচনী সমঝোতা’ বললেও, দলটির ভেতরেই এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। জামায়াতের ধর্মতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে প্রগতিশীল তরুণদের এই সখ্য অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা ও নারী নেত্রী মেনে নিতে না পেরে দলত্যাগ করেছেন। ফলে তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটারদের বড় একটি অংশ এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী বা বিকল্প ধারার রাজনীতির দিকে ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রভাব আওয়ামী লীগ দলগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও তাদের কয়েক দশকের স্থায়ী ৩০-৪০ শতাংশ ভোটব্যাংক এখন বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা এবং তাদের মিত্ররা ‘স্বতন্ত্র’ পরিচয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ভোটারদের একটি অংশ মনে করছে, এই নীরব ভোটব্যাংক যেদিকে যাবে, জয়ের পাল্লা সেদিকেই ভারী হবে। বিএনপি এবং জামায়াত উভয় পক্ষই এই ভোটারদের নিজেদের দিকে টানতে উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির কথা বলছে। তবে আওয়ামী ঘরানার প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত কতটা প্রভাব ফেলতে পারবেন, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের গ্রহণযোগ্যতার ওপর।
নির্বাচনী ফলাফল ও ভবিষ্যতের পূর্বাভাস সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে জনপ্রিয়তার ব্যবধান আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। কিছু জরিপে দেখা গেছে, দুই দলের ভোট পাওয়ার ব্যবধান মাত্র ১ শতাংশের কাছাকাছি। এমন অবস্থায় ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের লড়াই নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আদর্শ—উদার গণতন্ত্র নাকি ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ—সেটি নির্ধারণের চূড়ান্ত পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, এই লড়াইয়ে যারা দেশের শিক্ষিত বেকার তরুণদের কর্মসংস্থান এবং দুর্নীতিরোধের সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দিতে পারবে, তারাই শেষ হাসি হাসবে।



















