রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে পাশবিকভাবে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করার মামলায় ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন তার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ও মা পারভীন আক্তার. মঙ্গলবার (২ জুন) মামলার আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের লোমহর্ষক বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা. একপর্যায়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে অসুস্থ বোধ করায় আদালতের অনুমতি নিয়ে চেয়ারে বসে তাঁর জবানবন্দি সম্পন্ন করেন. আদালতে তিনি জানান, ঘটনার দিন সকালে অফিসে যাওয়ার পর স্ত্রীর আকুল ফোন পেয়ে তিনি দ্রুত পল্লবীর বাসায় ছুটে আসেন এবং ভবনের তৃতীয় তলায় আসামিদের ফ্ল্যাটের সামনে প্রতিবেশীদের ভিড় দেখতে পান, যারা সন্দেহ করছিলেন যে রামিসা ওই ফ্ল্যাটের ভেতরেই আটকে আছে.
আব্দুল হান্নান মোল্লা তাঁর সাক্ষ্যে বলেন, স্থানীয় লোকজন তালাবদ্ধ দরজা ভাঙার চেষ্টা করার একপর্যায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন ভেতর থেকে মূল লকটি খুলে দেন. ঘরে প্রবেশ করার পরপরই তিনি টয়লেটের সামনে রক্তের দাগ দেখতে পান এবং ঘরের ভেতর তল্লাশি চালাতে গিয়ে আসামিদের ব্যবহৃত কক্ষের ভারী স্টিলের খাটটি উঁচু করতেই নিচে নিজের আদরের মেয়ের বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান. এই নারকীয় ও কলিজা ফেটে যাওয়া দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার সাথে সাথেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং পরবর্তীতে পুলিশ এসে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর তিনি বাদী হয়ে থানায় এজাহার দায়ের করেন. জেরা করার সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীর প্রশ্নের জবাবে বাবা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, তিনি আদালতে যা বলেছেন তা নিজের চোখে দেখা ঘটনার ভিত্তিতেই বলেছেন এবং আসামিদের সাথে তাঁর পূর্ব কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না.
এর আগে আদালতে হাজির হয়ে রামিসার মা পারভীন আক্তারও তাঁর অশ্রুসিক্ত জবানবন্দি পেশ করেন. তিনি আদালতকে জানান, ঘটনার দিন সকালে তিনি ঘরের রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকায় বড় মেয়েকে বলেছিলেন ছোট বোন রামিসাকে নিয়ে এক আত্মীয়ের বাসায় যেতে. কিছু সময় পর কোনো শব্দ না পেয়ে তিনি ভাবেন তারা চলে গেছে, কিন্তু বড় মেয়ে একা ফিরে এলে রামিসার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ পায়. এরপর ভবনের বিভিন্ন তলায় হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে তৃতীয় তলায় আসামিদের ফ্ল্যাটের দরজার নিচে তিনি রামিসার ছোট্ট জুতা জোড়া দেখতে পান. বারবার দরজা ধাক্কা দিলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি চিৎকার শুরু করলে ভবনের বাসিন্দারা জড়ো হন এবং দরজার ফাঁক দিয়ে মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় উঁকি দিয়ে দেখা যায় ফ্ল্যাটের ভেতরে আসামি স্বপ্না খাতুন উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটাহাঁটি করছেন.
পারভীন আক্তার কাঠগড়ায় উপস্থিত আসামিদের দেখিয়ে আদালতে বলেন, “ওরে ওই সময় বলছি, বোন দরজা খুলে দে” এবং প্রধান আসামি সোহেল রানাকে নির্দেশ করে বলেন, “ধর্ষণ ও হত্যাও করেছে”. জেরার মুখোমুখি হয়ে তিনি জোরালো দাবি করেন যে, সোহেল রানা নিজে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন এবং তাঁর স্ত্রী স্বপ্না খাতুন তাঁকে এই জঘন্য অপরাধ লুকাতে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন. এছাড়া ঘটনার পর সোহেল রানা পেছনের গ্রিল কেটে পালিয়ে গেছেন বলে তিনি স্থানীয়দের কাছ থেকে শুনেছেন. দুই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হওয়ার পর ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন.



















