সরকারি কর্মচারীদের যেকোনো ধরনের আন্দোলনে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ‘সরকারি চাকরি (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়েছে। গতকাল বুধবার আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরীর স্বাক্ষরে জারি হওয়া এই অধ্যাদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। নতুন এই বিধান অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী যদি আন্দোলনে অংশ নেন, কর্মে অনুপস্থিত থাকেন, অথবা অন্য কোনো কর্মচারীকে কর্তব্য পালনে বাধা দেন, তাহলে তাকে বাধ্যতামূলক অবসর বা চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হতে পারে।
আন্দোলনে কঠোর দণ্ড, কেন এই অধ্যাদেশ?
অধ্যাদেশের মূল উদ্দেশ্য হলো সরকারি কাজে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী যেকোনো অসদাচরণ কঠোরভাবে দমন করা। যদিও অধ্যাদেশে সরাসরি ‘আন্দোলন’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়নি, তবে আইনজীবীদের মতে, এর ইঙ্গিত স্পষ্টতই সরকারি কর্মচারীদের আন্দোলনকে লক্ষ্য করে। বর্তমান আইনে সরকারি কর্মচারীরা আন্দোলন করলে নিজেরা যেমন কাজ থেকে বিরত থাকেন, তেমনি অন্যদেরকেও কাজে যোগদানে বিরত রাখতে চাপ সৃষ্টি করেন। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই এই সংশোধনী আনা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, যেহেতু সংসদ বর্তমানে ভেঙে যাওয়া অবস্থায় আছে এবং আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরিস্থিতি বিদ্যমান, তাই সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি এই অধ্যাদেশ জারি করেছেন।
নতুন বিধিমালায় যা থাকছে:
- ৩৭(ক) সরকারি কর্মচারীদের আচরণ ও দণ্ড সংক্রান্ত বিশেষ বিধান:
- কোনো সরকারি কর্মচারী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করলে।
- আইনসংগত কারণ ছাড়া সরকারের কোনো আদেশ, পরিপত্র, নির্দেশ অমান্য করলে বা বাস্তবায়নে বাধা দিলে, অথবা অন্য কর্মচারীকে প্ররোচিত করলে।
- ছুটি বা যুক্তিসংগত কারণ ব্যতীত অন্যান্য কর্মচারীর সাথে সমবেতভাবে নিজ কর্ম হতে অনুপস্থিত বা বিরত থাকলে।
- অন্য কোনো সরকারি কর্মচারীকে তার কর্মে উপস্থিত হতে বা কর্তব্য সম্পাদনে বাধা দিলে – এসবই ‘সরকারি কর্মে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে।
- দণ্ডের বিধান (৩৭ এর উপ-ধারা (২)): উপরিউক্ত অসদাচরণের জন্য দায়ী সরকারি কর্মচারীকে নিম্নোক্ত যেকোনো দণ্ড প্রদান করা যাবে:
- নিম্নপদ বা নিম্নবেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ।
- বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান।
- চাকরি হতে বরখাস্ত।
তদন্ত প্রক্রিয়া ও আপিলের সুযোগ
যদি কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে এই ধারার অধীনে অসদাচরণের অভিযোগ ওঠে, তবে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি অভিযোগ গঠন করবেন। অভিযুক্তকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে এবং ব্যক্তিগতভাবে শুনানি করতে ইচ্ছুক কি না, তাও জানতে চাওয়া হবে।
রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রদত্ত আদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি আপিল করা যাবে না। তবে, দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মচারী দণ্ড আরোপের আদেশ প্রাপ্তির ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ধারা ৩৬ অনুযায়ী আদেশ পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) জন্য রাষ্ট্রপতির নিকট আবেদন করতে পারবেন। রাষ্ট্রপতি যেরূপ উপযুক্ত মনে করবেন, সেইরূপ আদেশ প্রদান করবেন এবং এই রিভিউয়ের আদেশই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
এই অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর সরকারি কর্মচারীদের আন্দোলনসহ যেকোনো ধরনের কর্মবিরতি বা কাজে বাধা সৃষ্টির ঘটনা কঠোর হাতে দমন করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত। তবে, এটি সরকারি কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আইনি বিতর্ক ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।


















