২০০৯-১০ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি বাংলাদেশের আর্থিক ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায়, যা হাজার হাজার বিনিয়োগকারীকে নিঃস্ব করেছিল এবং দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল। তৎকালীন সরকার, দেশের ইতিহাসে ভয়াবহতম এই ধসের পর, প্রয়াত বিশিষ্ট ব্যাংকার খন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের পর কেলেঙ্কারির মূল হোতাদের চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে অন্যতম হোতা হিসেবে যাদের নাম উঠে এসেছিল, তাদের মধ্যে সালমান এফ রহমান এবং তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল (লোটাস কামাল) ছিলেন উল্লেখযোগ্য।
তদন্ত প্রতিবেদন এবং ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ
ইব্রাহিম খালেদ কমিটি তাদের প্রতিবেদনে মোস্তফা কামালের তৎকালীন মালিকানাধীন লোকসানি কোম্পানি সিএমসি কামাল টেক্সটাইলের শেয়ারের দর ১৬ গুণ পর্যন্ত অস্বাভাবিক বৃদ্ধির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, লোকসানি হওয়া সত্ত্বেও যখন কোম্পানিটির শেয়ারদর অস্বাভাবিক হারে বাড়ছিল, তখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে রুটিন মাফিক ‘দর বৃদ্ধির কোনো কারণ আছে কি না’ জানতে চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে, মোস্তফা কামাল তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য এবং অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি হওয়ায় তার কোম্পানির বিষয়ে কোনো তদন্ত করা হয়নি।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৯-১০ সালে শেয়ার কারসাজির জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন কৌশল, যেমন – স্টক ডিভিডেন্ডের গুজব ছড়ানো, কোম্পানির সম্পদ পুনর্মূল্যায়নের খবর এবং রাইট শেয়ার বিক্রি করে মূলধন বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো কামাল তার কোম্পানির ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিলেন। ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারকে ভেঙে ১০ টাকার ১০টি শেয়ারে রূপান্তর করেও তিনি দর বৃদ্ধিতে সহায়তা করেন। এভাবে তার কোম্পানির শেয়ারদর অভিহিত মূল্যের তুলনায় ১৬ গুণ বেড়ে যায়। এমন দর বৃদ্ধির পর কামাল এবং তার পরিচালক সদস্যরা স্টক ডিভিডেন্ড হিসেবে প্রাপ্ত শেয়ারগুলো প্রায় ২১ কোটি টাকা মূল্যে বিক্রি করেন।
যদিও ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত দলে মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আনা হয়, তিনি ঢাকা রিপোর্টার্স ফোরামের এক সংবাদ সম্মেলনে সিএমসি কামাল কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজিতে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, কোম্পানিতে তার ও পরিবারের সদস্যদের মূল শেয়ারের একটিও বিক্রি করেননি, কেবল স্টক ডিভিডেন্ড হিসেবে পাওয়া শেয়ার বিক্রি করেছিলেন। তবে, এক প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেন যে, শুধু বোনাস শেয়ার বিক্রি করেই ২১ কোটি টাকা পেয়েছিলেন, যেখানে কোম্পানিতে তাদের মোট বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৭ কোটি টাকা। এই বিপুল মুনাফার উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি তড়িঘড়ি করে সংবাদ সম্মেলন শেষ করেন।
আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা ও শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রণ
অভিযোগ রয়েছে, মোস্তফা কামাল শেয়ার কেনাবেচা করে বিপুল অঙ্কের মুনাফা করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সমালোচনার মুখে তিনি কোম্পানিটি আলিফ গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেন। এরপর তিনি নিজে সরাসরি শেয়ার ব্যবসা না করলেও, তার মেয়ে নাফিসা কামালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কারসাজি গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজশ করে শত শত কোটি টাকা মুনাফা এবং সেই অর্থের বড় অংশ দুবাইতে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
২০১০ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে লোটাস কামালের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ওঠার পরও শেখ হাসিনা সরকারের আমলে তাকে কোনো ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি। তার সিন্ডিকেটের কারসাজিতে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী নিঃস্ব হয়েছেন এবং তাদের পুঁজি লোপাট করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনকালে যখনই শেয়ার কারসাজি ও জাল-জালিয়াতির কথা উঠেছে, তখনই ঘুরেফিরে এসব নাম সামনে চলে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা বাজার কারসাজিতে সহায়তা করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদগুলোতে নিজেদের পছন্দের লোক বসিয়েছেন এবং বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনার থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের বিভাগীয় দায়িত্বও তারা ঠিক করে দিতেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, মোস্তফা কামালের দৃশ্যমান কোনো বড় ব্যবসা না থাকা সত্ত্বেও তিনি হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, যার প্রধান উৎস হিসেবে শেয়ারবাজারের কারসাজিকেই দায়ী করা হয়। একাধিক সূত্র ইঙ্গিত দেয় যে, বর্তমানেও শেয়ারবাজারে যে নানা ঘটনা ঘটছে, তার পেছনে লোটাস কামালের গ্যাংদের হাত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, লোটাস কামালসহ চিহ্নিত কয়েকজন ‘মাফিয়ার’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে শেয়ারবাজার কখনই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। ইব্রাহিম খালেদের তদন্তে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও আইনি ব্যবস্থার সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় তিনি অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন এবং পুরো শেয়ারবাজারকে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে নেন।



















