সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার দাবি করেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। এ ঘটনায় সৌদি আরবের জাতীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়ার একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে আগুন ধরে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিমানবন্দর থেকে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে উড়োজাহাজটিতে আগুন জ্বলতে এবং অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। সৌদি বিমানবন্দরগুলোতে ধারাবাহিক হামলার অংশ হিসেবে এ ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, তাঁদের বাহিনী দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে নাজরান বিমানবন্দর ও খামিস মুশাইত বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে হুথিদের এ দাবি অস্বীকার করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। জোটের মুখপাত্র কর্নেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রিয়াদকে লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি এবং খামিস মুশাইতকে লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে।
রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় উভয় পক্ষের এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল
বিমানবন্দরে হামলার ঘটনার পর এয়ার ইন্ডিয়া আগামী শনিবার পর্যন্ত রিয়াদগামী ও রিয়াদ থেকে ছেড়ে আসা সব ফ্লাইট বাতিল করেছে। লুফথানসা গ্রুপও সৌদি রাজধানীতে তাদের পরিচালিত সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, ৮ অক্টোবর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার বিষয়ে মার্কিন মিশন অবগত রয়েছে। এ সময় সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সতর্কবার্তায় আরও বলা হয়, সৌদি আরবে কর্মরত মার্কিন সরকারি কর্মচারীদের এখন থেকে বিমানবন্দরটি ব্যবহারের জন্য বিশেষ অনুমতি নিতে হবে।
আগের হামলায় নিহত তিন, আহত ৩৬
চলতি সপ্তাহের শুরুতে সৌদি আরবের আভা ও কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলা হয়েছিল বলে জানিয়েছে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
গত মঙ্গলবার ও বুধবারের ওই হামলায় তিনজন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে আভায় দুজন এবং রিয়াদে একজন বিদেশি নাগরিক ছিলেন। এ ছাড়া অন্তত ৩৬ জন আহত হন। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইয়েমেনের স্থলযুদ্ধেও বাড়ছে উত্তেজনা
বিমানবন্দরে হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশে সরকার সমর্থিত বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। সরকার সমর্থিত বাহিনী অগ্রসর হয়ে এডেন, লাহেজ ও তাইজের মধ্যে সংযোগকারী আল-কাদাহা ও আল-ওয়াজিয়াহ রুট বিচ্ছিন্ন করার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এর জবাবে হুথিরা নতুন সরবরাহপথ তৈরির লক্ষ্যে আল-শামায়াতায়েন, আল-মা’ফের এবং দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে অভিযান জোরদার করেছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থনপুষ্ট সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে নজর রাখা আল-ওয়াজিয়াহ ও কাহবুব পর্বতমালার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করেছেন ইয়েমেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এ পরিস্থিতিতে সামরিক কমান্ডাররা আগামী ৪৮ ঘণ্টায় সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, পশ্চিমাঞ্চলীয় ফ্রন্টে হুথিরা ধুবাবের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। এলাকাটি এডেন-তাইজের গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথের নিয়ন্ত্রণের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি বাহিনীর অভিযান নিয়েও হুথিদের দাবি
পৃথক এক বিবৃতিতে ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, পূর্বাঞ্চলীয় আল-জাওফ প্রদেশে হুথি অবস্থানের দিকে সৌদি বাহিনীর অগ্রযাত্রা প্রতিহত করেছে তাঁদের বাহিনী। তাঁর দাবি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি সেনাদের কয়েক ডজন হতাহত হয়েছেন এবং সৌদি বাহিনী কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
সারি আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক সংঘাত বৃদ্ধির পর থেকে সৌদি ও জোট বাহিনী মোট ১ হাজার ৬৪২টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে এসব দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গভীর হচ্ছে ইয়েমেনের মানবিক সংকট
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় দেশটির দীর্ঘদিনের মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি) জানিয়েছে, গত জুলাই থেকে ইয়েমেনে নিখোঁজ আত্মীয়দের সন্ধান চেয়ে তারা পরিবারের পক্ষ থেকে ১ হাজার ৮০০টি অনুরোধ পেয়েছে।
ইয়েমেনে আইসিআরসির প্রতিনিধিদলের প্রধান ক্রিস্টিন চিপোলা বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের তাঁদের প্রিয়জনদের ভাগ্য ও অবস্থান জানার অধিকার রয়েছে। প্রতিটি নিখোঁজ ব্যক্তির পেছনে একটি পরিবার চরম অনিশ্চয়তা ও যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাঁদের কষ্ট উপেক্ষা করা যায় না এবং অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হওয়া উচিত নয়।
সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে হামলার দাবি, পাল্টা সামরিক অভিযান এবং ইয়েমেনের বিভিন্ন ফ্রন্টে লড়াই—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে আঞ্চলিক সংঘাত বিস্তারের আশঙ্কা বাড়ছে।
সূত্র: টেলিগ্রাফ ইউকে


















