জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত অবস্থান, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ এবং বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ও ৩১ দফার ভিত্তিতে সংবিধানের সম্ভাব্য ১৮তম সংশোধনের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
তবে গণভোটের ফলাফল ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট এবং নির্বাচনি ইশতেহারের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি চলতি বছরের মধ্যেই সংশোধনের খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া হয়। বৈঠকে ২৬টি রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ১৫টি দল সরাসরি অংশ নেয় এবং একটি দল লিখিত প্রস্তাব দেয়। বৈঠক শেষে ২০২৬ সালের মধ্যেই সংবিধান সংশোধনের খসড়া তৈরির সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
এর আগে গত ৪ আগস্ট বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে জুলাই সনদকে সংবিধান সংশোধনের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কমিটি।
গণভোটে কী ছিল
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত প্রস্তাবের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে একটি প্রশ্নের জবাব দিতে হয়।
গণভোটের প্রশ্নে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রক্রিয়া, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ এবং সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের অনুমোদনের বিষয় রাখা হয়েছিল।
এ ছাড়া সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হওয়া ৩০টি প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয়ও গণভোটের প্রশ্নে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত ফল অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮০টি। ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ২৩১টি।
বাস্তবায়ন আদেশে কী ছিল
২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। ওই আদেশে গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবের অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
আদেশ অনুযায়ী, গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘হ্যাঁ’ ভোট পাওয়া গেলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের কথা ছিল। পরিষদকে প্রথম অধিবেশন শুরুর পর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদ ও গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করার কথা বলা হয়।
আদেশে সংসদের একটি ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠনের কথাও বলা হয়েছিল। নিম্নকক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর পাওয়া ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব রাখা হয় এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনুমোদনের কথাও উল্লেখ ছিল।
বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে ব্যাখ্যা
বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই সনদের ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবের মধ্যে যেগুলোতে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য নেওয়া হবে। আর বিএনপি যেসব বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে, সেগুলোও সেই ভিন্নমতসহ বিবেচনায় রাখা হবে। পাশাপাশি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে থাকা সংশ্লিষ্ট সংস্কার প্রস্তাবও বিবেচনা করা হবে।
বিশেষ কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত থাকলে এবং সেই অবস্থান নির্বাচনি ইশতেহারে প্রতিফলিত হলে তা বিবেচনায় আসবে।
এদিকে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০ সেপ্টেম্বরের মতবিনিময়ে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের কোনো দল এবং ইসলামী আন্দোলন অংশ নেয়নি।
উচ্চকক্ষ নিয়ে নতুন অবস্থান
১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এ বিষয়ে অনেক দল একমত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উচ্চকক্ষ সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবে না; বরং সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর পাওয়া আসনের আনুপাতিক হারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে এটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে উচ্চকক্ষের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা থাকবে না বলেও তিনি জানিয়েছেন।
বিশেষ কমিটি প্রতিবেদন দেওয়ার পর আইন মন্ত্রণালয় সংশোধনী বিলের খসড়া তৈরি করে সংসদে উপস্থাপন করবে বলে কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সংশোধনীর চূড়ান্ত রূপ কী হবে, তা বিশেষ কমিটির সুপারিশ, রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত এবং পরবর্তী সংসদীয় প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।


















